Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

অভিবাসন ব্যয় কমানো ছাড়া বাড়বে না বৈদেশিক কর্মসংস্থান

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯

অভিবাসন ব্যয় কমানো ছাড়া বাড়বে না বৈদেশিক কর্মসংস্থান

বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অস্বাভাবিক অভিবাসন ব্যয়। কবি নহরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ বখতিয়ার দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক কলামে এ মতামত ব্যাক্ত করেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভিয়েতনামের কর্মীদের নিয়োগ ব্যয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একজন পুরুষ কর্মীকে বিদেশে যেতে গড়ে ৫ হাজার ৫০০ ডলার বা প্রায় ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ ব্যয় সাত মাসের আয়ের সমান হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১৫ মাসের আয়ের সমান। সৌদি আরবগামী কর্মীদের জন্য এ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ মাসের আয়ের সমান। ফলে বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় এ ব্যয় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।

অভিবাসন ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বহুস্তরবিশিষ্ট নিয়োগ ব্যবস্থা। অধিকাংশ রিক্রুটিং এজেন্সি সরাসরি বিদেশি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে না; বরং বিদেশি দালালদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে কিনে আনে। একাধিকবার হাতবদল হওয়া এসব চাহিদাপত্র শেষে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি স্তরে কমিশন যোগ হয়, আর শেষ পর্যন্ত পুরো বোঝা বহন করতে হয় কর্মীদের।

বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুযায়ী, বিমান ভাড়া নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে কম বেতনে কর্মী পাঠানোর চুক্তিও করা হয়। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমছে, অথচ বাংলাদেশ থেকে সরবরাহ বাড়ছে। দক্ষতার অভাবে দরকষাকষির ক্ষমতা কম থাকায় অভিবাসন ব্যয় আরো বেড়ে যাচ্ছে।

দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবীরা তুলনামূলক কম খরচে বিদেশে যেতে পারেন। বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় কম। এটি প্রমাণ করে, চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য থাকলে অভিবাসন ব্যয় কমানো সম্ভব। তাই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিমান ভাড়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং দুর্নীতি রোধ করতে হবে।

অভিবাসন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবও বড় সমস্যা। অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক রাজনীতিতে সক্রিয়। তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে অভিবাসন ব্যয় বাড়ানো হয়। উদাহরণস্বরূপ, লক্ষ্মীপুরের এক সাবেক সংসদ সদস্য কুয়েতে ভিসা বাণিজ্য ও ঘুষের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল, তিনি ২০ হাজারের বেশি কর্মীকে সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের সাত গুণ বেশি অর্থে পাঠিয়েছিলেন।

অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় শুধু কর্মীদের নয়, শ্রমগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্যও সমস্যা তৈরি করে। অনেক কর্মী ব্যয় পুষিয়ে নিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। মালয়েশিয়া ২০১২ সালে সরকার-টু-সরকার পদ্ধতি চালু করে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছিল। তবে দুর্নীতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে উদ্যোগটি টেকসই হয়নি।

ফলে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ মূলত সচ্ছল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। গ্রামীণ এলাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও সামাজিক বৈষম্য আরো তীব্র হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অভিবাসন ব্যয় কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশে এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

Logo