গলায় কাঁটা ফুটলে যেমন অন্য মানুষের একটা সাহায্যের হাতের দরকার হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেরও হয়েছে সেই দশা। ইরান যুদ্ধ, হরমুজ বন্ধ; ট্রাম্প তার গলার এই দুই কাঁটা সরাতে এখন সেই হাতটাই পেতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন, চীনের প্রেসিডেন্ট কি তাকে সাহায্য করবেন?
ইরানকে বাগে আনতে কি তবে চীনের দ্বারস্থ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনীতির সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে গেছে চীনের বেইজিংয়ে, যেখানে ট্রাম্প বৈঠক করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে।
প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে যখন ওয়াশিংটন মরিয়া, তখন সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনার বদলে কেন আমেরিকার জন্য চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা জরুরি হয়ে উঠল?
আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বাণিজ্য, শুল্ক, সেমিকন্ডাক্টর এবং ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দুই প্রধান শক্তির এই বৈঠকের অন্তরালে রয়েছে আরো বড় কোনো কিছু। আর তা হলো পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে?
সামরিক শক্তির দিক থেকে আমেরিকা বিশ্বসেরা, সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সামরিক শক্তি আর কৌশলগত শক্তি যে এক নয়, ইরানের সাথে যুদ্ধে গিয়ে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে আমেরিকা।ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে আমেরিকা এখন অনেকটা বেকায়দায় পড়ে গেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির পরের ঘটনাবলির দিকে তাকালে তার গভীরতা আন্দাজ করা যায়। আমেরিকা আগে ইরানকে আক্রমণ করল, কিন্তু ইরানে সরকারের পতন হয়নি, ইরান আত্মসমর্পণও করেনি, উল্টো হরমুজ বন্ধ রেখে ডুগডুগি বাজাচ্ছে ইরান। এখন আমেরিকা না পারছে চুক্তি করতে, না পারছে হরমুজ খুলে দিতে। গ্লোবাল ইকোনমি হরমুজ বন্ধের যন্ত্রণা তীব্রভাবে বুঝতে পারছে। বিশ্ব বাণিজ্যের সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়ে গেছে।
আমেরিকায় তেলের দাম, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে এখন মার্কিনিরা ইরান যুদ্ধ নিয়ে আর আগ্রহ দেখাতে রাজি না। ঘরে-বাইরে তাই প্রবল চাপ মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামনে। আর তাই ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটা রাস্তা দরকার ট্রাম্পের। কার কাছে যাবেন তিনি? কে দেবে আশা, কেই বা তাকে ভরসা দেবে?
এই প্রেক্ষাপটে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেলের বড় ক্রেতা হলো চায়না এবং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াশিংটনের আশা, বেইজিং যদি তেহরানকে আলোচনায় ফিরতে উৎসাহিত করতে পারে, তবে তা কার্যকর হলেও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যখন একটি পরাশক্তি তার প্রতিপক্ষকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তৃতীয় শক্তির সহায়তা চায়, তখন তা কূটনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাদের মতে, ইরান সংকটে বিশ্ব বাস্তবতার সেই চিত্রটাই যেন ফুটেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এবারের চীন সফরে।
হরমুজ বন্ধের কারণে চীনে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও চীন পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আগে থেকেই এর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। বছরের পর বছর চীন ইরানের জ্বালানি তেল মজুত করে জ্বালানির বিভিন্ন বিকল্প বের করেছে। রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনেশিয়েটিভসের আওতায় ট্রেনে করে ইরানের তেল যাচ্ছে চীনে। ফলে এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন ও ইরানের কৌশলগত অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল বলে মনে করা হচ্ছে।
তাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ করে হরমুজ খোলার বিষয়ে ইরান বা চীন নয়, বরং মরিয়া ট্রাম্পের দেশ আমেরিকাই। এখন দেখার বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে কী পদক্ষেপ নেয় চীন আর ইরান। বিশ্ব কূটনীতির নজর এখন বেইজিং আর নতুন পরাশক্তি তেহরানের দিকে।
logo-1-1740906910.png)