Logo
×

Follow Us

ইউরোপ

শরিফুল হাসানের কলাম

এথেন্সের ওমোনিয়ায় ছোট্ট এক বাংলাদেশ

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৯

এথেন্সের ওমোনিয়ায় ছোট্ট এক বাংলাদেশ

ইউরোপ সফরের শেষ দিনটি কাটল গ্রিসে। সকালটা শুরু হয়েছিল গ্রিসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা আপার সঙ্গে আন্তরিক এক সাক্ষাতের মাধ্যমে। অনেক বছর ধরেই তাঁকে চিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার শাখার মহাপরিচালক হিসেবে কিংবা রাষ্ট্রদূত মানুষের প্রতি, বিশেষ করে অভিবাসীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা সব সময়ই আমাকে মুগ্ধ করেছে। দীর্ঘদিন পর আজ এথেন্সে আবার দেখা হওয়ায় খুব ভালো লাগল।

তাঁর সঙ্গে প্রতিবারের মতো এবারো মনে হলো কূটনীতি শুধু রাষ্ট্র বা সরকারের সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

মাননীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনায় গ্রিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের কার্যক্রম, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, প্রবাসীদের মৃত্যু, মরদেহ দেশে পাঠানো, নৈতিক নিয়োগ, দেশে ফিরে আসা অভিবাসীদের পুনরেকত্রীকরণ, লিবিয়া হয়ে গ্রীসে বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসনের বর্তমান বাস্তবতাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

আলোচনায় আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের সহ-অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘প্রত্যাশা’ এবং ফ্রন্টেক্সের পুনরেকত্রীকরণ কর্মসূচির বিষয়গুলো তুলে ধরি। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ অভিবাসন এবং বৈধ শ্রম অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণে আমাদের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মার্জিয়া সুলতানা এবং তৃতীয় সচিব (রাজনৈতিক) রায়হান ফেরদৌসও উপস্থিত ছিলেন। গ্রিসে বাংলাদেশি কর্মীদের বর্তমান অবস্থা, শ্রমবাজারের সম্ভাবনা, দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ, কর্মীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ আরো সম্প্রসারণ নিয়ে তাঁদের মূল্যবান মতামত ও অভিজ্ঞতা আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে।

একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা। এখনো অনেক বাংলাদেশি দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই পথ শুধু অনিশ্চিত নয়, অনেকের জন্য তা মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। যারা বেঁচে পৌঁছান, তাঁদেরও অনেককে দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা, শোষণ এবং মানবেতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

তাই নিরাপদ, নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনের কোনো বিকল্প নেই। অভিবাসন যেন ঝুঁকির পথ না হয়ে সম্ভাবনার পথ হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সবার লক্ষ্য।

গ্রিস ইউরোপে বাংলাদেশিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। এখানে কৃষি, পর্যটন, নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও বেশি বাংলাদেশি যদি বৈধ পথে এখানে কাজের সুযোগ পান, তাহলে তা হবে বাংলাদেশ ও গ্রিস উভয় দেশের জন্যই লাভজনক।

দূতাবাসে বৈঠক শেষে চলে গেলাম এথেন্সের ওমোনিয়া এলাকায়। বহু বছর ধরে এই এলাকা গ্রীসে বাংলাদেশিদের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ওমোনিয়ার রাস্তাগুলো যেন আরও বেশি বাংলাদেশি হয়ে ওঠে। একের পর এক বাংলা সাইনবোর্ড, বাংলাদেশি মুদি দোকান, মোবাইল ফোনের দোকান, ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান; মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, যেন ঢাকার কোনো পরিচিত এলাকায় হাঁটছি।

একটি দোকানে ঢুকে দেশি সবজি, চাল, ডাল, মসলা আর পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্য দেখে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও মানুষ কী অসাধারণভাবে নিজের শেকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে! বাংলা ভাষায় কথাবার্তা, চায়ের কাপে আড্ডা, দেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে গ্রামের খবর; সব মিলিয়ে ওমোনিয়া শুধু একটি এলাকা নয়, অনেক প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে এটি যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশ।

এখানকার প্রবাসীদের কেউ এসেছেন দশ-পনেরো বছর আগে, কেউ এখনো নতুন করে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে গ্রিসে আনুমানিক ৪৫ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ এথেন্সসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি, নির্মাণ, রেস্টুরেন্ট, ছোট ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবাখাতে কাজ করছেন। নিজেদের পরিবারের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি তাঁরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

ইউরোপ সফরের শেষ বিকেলে ওমোনিয়ার অপরিচ্ছন্ন রাস্তায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সিলেট সমিতির পোস্টার দেখে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল অভিবাসন শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার গল্প নয়। এটি ঘর ছেড়ে নতুন করে জীবন গড়ার গল্প; বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প; সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার গল্প।

১৩ দিন আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাত্রা শুরু করেছিলাম প্রবাসীদের গল্প শুনতে। ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, সাইপ্রাস হয়ে আজ এথেন্সে এসে সেই যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েছি। রোম, বার্সেলোনা, লিসবন, নিকোসিয়া কিংবা এথেন্স প্রতিটি শহর আমাদের কিছু মানুষ, কিছু গল্প আর কিছু গভীর উপলব্ধি দিয়ে গেছে। 

এই পুরো সফরে একটি বাক্য বারবার শুনেছি, যা আমাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে—

“আপনারা আমাদের কথা শুনতে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, এজন্য ধন্যবাদ।”

এই ভালোবাসা ও বিশ্বাসই আমাদের দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়। অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ, নিয়মিত ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের জন্য আমাদের কাজ আরো অনেক দূর এগিয়ে নিতে হবে, যাতে ভালো থাকে সব প্রবাসী। ভালো থাকে বাংলাদেশ!

(শরিফুল হাসান ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান। বর্তমানে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে প্রবাসীদের সাথে দেখা করছেন, তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয় কথা বলছেন। তিনি এই বিরল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত। মাইগ্রেশন কনসার্নকে তিনি এই লেখাগুলো পাঠকের জন্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন।)

Logo