শরিফুল হাসানের কলাম
সাইপ্রাসে কেমন আছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৬
সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের সঙ্গে আজ দীর্ঘ সময় কথা বলতে বলতে বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম ১৫ বছর আগের সময়ে। ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে আমি একটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম—"মিথ্যা প্রলোভনে পাঠানো হচ্ছে, সাইপ্রাসে কষ্টে বাংলাদেশি ছাত্ররা"।
তখন লিখেছিলাম, ভালো প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া, অতিরিক্ত সময়ে চাকরি, লাখ লাখ টাকা আয় এবং ইউরোপের যে কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগের প্রলোভনে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সাইপ্রাসে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন; কাজের সুযোগ সীমিত, অন্য ইউরোপীয় দেশে যাওয়ার বৈধ পথও নেই। ফলে অনেক বাংলাদেশিই পড়েন চরম অনিশ্চয়তা ও সংকটে।
আজ ১৮ জুলাই ২০২৬। ১৫ বছর পর এসে দেখলাম পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি; বরং সংকট আরো জটিল হয়েছে। কিন্তু প্রলোভনে পড়া মানুষের সংখ্যা কমেনি।
ইইউর সদস্য হলেও সাইপ্রাস শেনজেনভুক্ত নয়। মাত্র ৯ হাজার ২৫১ বর্গকিলোমিটারের এই পর্যটননির্ভর দেশটিকে বাইরে থেকে যতটা ঝকঝকে মনে হয়, ভেতরে ততটাই লুকিয়ে আছে হাজারো বাংলাদেশির হতাশা, অনিশ্চয়তা আর ভাঙা স্বপ্নের গল্প।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি ফেরত পাঠানো হয় সাইপ্রাস থেকে। কিন্তু সংকট যে এতটা গভীর, তা এখানে না এলে বোঝা সম্ভব ছিল না।
আজ যেসব শিক্ষার্থী আমাদের সঙ্গে কথা বললেন, তাঁদের অনেকেই জানালেন- বাংলাদেশ থেকে আসার আগে তাঁরা জানতেনই না যে সাইপ্রাস দ্বীপটি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রিক সাইপ্রাস, অন্যদিকে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তর সাইপ্রাস।
অনেকেই ভেবেছিলেন, একবার সাইপ্রাসে এলেই সহজে ইউরোপের অন্য দেশে যাওয়া যাবে। বাস্তবে সেটি সম্ভব নয়। কেউ কেউ আবার ঝুঁকি নিয়ে তথাকথিত ‘জাম্পিং ভিসা’র পথ বেছে নেন, যা তাঁদের আরো বড় বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
শিক্ষার্থীরা জানালেন, প্রতি দুই-তিন বছর পরপর গ্রিক সাইপ্রাস বাংলাদেশিদের জন্য স্টুডেন্ট ভিসা বন্ধ করে, আবার চালু করে। সেই সুযোগে বাংলাদেশের কিছু এজেন্সি ও সাইপ্রাসে থাকা দালালচক্র নানা স্বপ্ন দেখিয়ে নতুন শিক্ষার্থী নিয়ে আসে। ১০–১২ লাখ টাকা খরচ করে এসে অনেকেই দেখেন কাজ নেই, অন্য ইউরোপীয় দেশে যাওয়ার সুযোগ নেই, ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।
আশ্রয়প্রার্থী হলে দীর্ঘদিন পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যায় না। বৈধভাবে অন্য ইউরোপীয় দেশেও যাওয়া যায় না। অনেকেই তখন বসনিয়া বা উত্তর মেসেডোনিয়া হয়ে ক্রোয়েশিয়া পেরিয়ে ইতালিতে প্রবেশের ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। কেউ সফল হন, অনেকেই ধরা পড়েন।
শুধু ছেলেরাই নন, একই সংকটে পড়ছেন অনেক বাংলাদেশি নারীও। ভুয়া হাউস সার্টিফিকেট, এক বাসায় ১৫-২০ জনের গাদাগাদি করে থাকা, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে পর্যটন কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগ আরো সংকুচিত হওয়া; এসব বাস্তবতার কথাও শুনলাম।
কয়েক দিন আগেই লারনাকায় কাজে যোগ দিতে বের হওয়া ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশি শাহরিয়ার আহমেদ (ইমন) আরেক বাংলাদেশির হাতে নিহত হয়েছেন। এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আজ শিক্ষার্থীরা মন খুলে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমরা তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনেছি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের সহ-অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘প্রত্যাশা’ এবং ফ্রন্টেক্স উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত পুনঃএকত্রীকরণ কর্মসূচির কথা তুলে ধরেছি। পাশাপাশি আশ্বস্ত করেছি, দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া মানুষের পুনঃএকত্রীকরণে ব্র্যাক পাশে থাকবে এবং তাঁদের উত্থাপিত সমস্যাগুলোও আমরা সংশ্লিষ্টদের কাছে তুলে ধরব।
ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কথা শুনতেই আমাদের এই সফর। গত ৯ জুলাই রোম থেকে যাত্রা শুরু। এরপর বার্সেলোনা, লিসবন, ব্রাসেলস পেরিয়ে আজ সাইপ্রাস। আগামীকাল গ্রিসে যাব।
এই দীর্ঘ সফরে প্রতিটি শহরে আমরা প্রবাসীদের সঙ্গে বসেছি। শুনেছি তাঁদের স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাফল্য, আবার এমন অনেক না-বলা কষ্ট, যা কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। আমার কাছে এটি শুধু একটি দাপ্তরিক সফর নয়; মানুষের জীবনের আরো কাছাকাছি যাওয়ার এক গভীর অভিজ্ঞতা।
সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে একটি বিষয়- মানুষ কথা বলতে চায়। কেউ তাঁদের গল্প মন দিয়ে শুনুক, সেটাই যেন তাঁদের সবচেয়ে বড় চাওয়া। তাঁরা যেভাবে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন, তাতে আরো দৃঢ়ভাবে মনে হয়েছে— প্রবাসীদের জন্য এখনো অনেক কিছু করার আছে। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
(শরিফুল হাসান ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান। বর্তমানে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে প্রবাসীদের সাথে দেখা করছেন, তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয় কথা বলছেন। তিনি এই বিরল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত। মাইগ্রেশন কনসার্নকে তিনি এই লেখাগুলো পাঠকের জন্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন।)
logo-1-1740906910.png)