শরিফুল হাসানের কলাম
পর্তুগালে বাংলাদেশি প্রবাসীদের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার গল্প!
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৯
পর্তুগালে প্রায় অর্ধলাখ বাংলাদেশির বসবাস। লিসবনের ঐতিহাসিক প্রাসা দো কোমের্সিওতে গতরাতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের উচ্ছ্বাস দেখার কয়েক ঘণ্টা পরই আমরা বসেছিলাম প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে। তাঁরাই অনুরোধ করেছিলেন, খেলা শেষে যেন মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। আমরাও তাই হাজারো মানুষের আনন্দধ্বনি, পতাকার ঢেউ আর উৎসবের আবহ ছেড়ে চলে এলাম এক ছোট্ট রেস্তোরাঁয়, যেখানে ফুটবলের আলোচনা নয়, উঠে এলো মানুষের জীবন, সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের উদ্যোগে লিসবনের লিটন টার্কিশ গ্রিল গতকাল রাতের জন্য যেন হয়ে উঠেছিল গল্প বলার একটি জায়গা। রোম, বার্সেলোনার পর লিসবন। তিনটি শহর, তিনটি দেশ; কিন্তু মানুষের কথাগুলো যেন একই সুতোয় গাঁথা।
কনস্যুলার সেবা, অভিবাসীদের অধিকার, ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, ব্যাংকিং সুবিধা, রেমিট্যান্স, দেশে বিনিয়োগ, বিদেশফেরতদের পুনর্বাসন; নানা বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলো। কথা বলতে বলতে বারবার মনে হয়েছে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না; তাঁরা প্রতিদিন তাঁদের শ্রম, সততা ও মেধা দিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁরা শুধু সহায়তা চান না, তাঁরা অংশীদার হতে চান। তাঁদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারলে অভিবাসন আরো নিরাপদ, আরো সুশৃঙ্খল এবং আরো মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে।
আলোচনায় অনেকেই একটি কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরলেন। লিসবন থেকে কোনো বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রায় চার হাজার ইউরো পর্যন্ত খরচ হয়। সেই অর্থ জোগাড় করতে অনেক সময় কমিউনিটির মানুষকেই চাঁদা তুলতে হয়, একের পর এক মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। একজন প্রবাসীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার যেন আরেকটি সংকটে না পড়ে— এ বিষয়ে কার্যকর সমাধান প্রয়োজন বলেই সবাই মত দিলেন।
আলোচনায় আরো একটি বিষয় জানলাম! বিদেশে থাকা পরিবারের জন্য কিছু উপহার নিয়ে দেশে ফিরলেও শুল্ক নীতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কী আনা যাবে, কী আনা যাবে না; এসব বিষয়ে আরো স্পষ্টতা প্রয়োজন। অনেকে দেশে বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু সহজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান না। তাঁদের অনুরোধ, আমরা যেন এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরি।
পর্তুগিজ ভাষা শেখার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক বাংলাদেশি বহু বছর ধরে এখানে থাকলেও ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে ভালো চাকরি, সরকারি সেবা কিংবা স্থানীয় সমাজের সঙ্গে আরো গভীরভাবে যুক্ত হতে পারছেন না। তাঁদের মতে, বাংলাদেশ থেকেই ভাষা শেখার প্রস্তুতি শুরু হওয়া উচিত, আবার পর্তুগালে এসেও শেখার সুযোগ থাকা দরকার। এ ক্ষেত্রে ব্র্যাক কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়েও তাঁরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
আলোচনায় আরেকটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে— ইউরোপে আসাটাই যথেষ্ট নয়; দক্ষতা নিয়েই আসতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, স্বীকৃত সনদ এবং প্রকৃত নিয়োগদাতার সঙ্গে সংযোগ ছাড়া ভালো কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন। একই সঙ্গে স্থানীয় আইন, সংস্কৃতি ও সমাজ সম্পর্কে জানাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের বিষয়টিও বারবার এসেছে। সবাই একমত— দালালের ওপর নির্ভর করে নয়, সঠিক তথ্য ও বৈধ পথেই বিদেশে যাওয়া উচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ট্যালেন্ট পার্টনারশিপের মতো উদ্যোগ দক্ষ বাংলাদেশিদের জন্য আরো বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে পুরো আলোচনায় যে কথাটি আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে, সেটি ছিল খুবই সাধারণ একটি বাক্য—
"আপনারা আমাদের কথা শুনতে এত দূর থেকে এসেছেন, এ জন্য ধন্যবাদ। এই আসাটা যেন একদিনের না হয়।"
রোমে শুনেছি, বার্সেলোনায় শুনেছি, লিসবনেও শুনলাম। তখন মনে হলো, মানুষ শুধু সমাধানই চায় না; মানুষ চায় কেউ মন দিয়ে তার কথা শুনুক। হয়তো সেখান থেকেই সমাধানের শুরু।
লিসবনে এই আয়োজন সফল করতে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে পর্তুগাল বাংলা প্রেস ক্লাব ও নটিসিয়াস বাংলাদেশ-কে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ সেই সব প্রবাসী বাংলাদেশিদের, যাঁরা রাতের ব্যস্ততার মধ্যেও সময় নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। ধন্যবাদ আমার দুই সহকর্মী হারুন ভাই ও রাকিবকে!
আপনারা জানেন, ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ ও প্রত্যাশা জানতেই আমাদের এই সফর। এক সপ্তাহ আগে রোমে পৌঁছানোর পর ইতালির কয়েকটি শহর, স্পেন ও পর্তুগাল ঘুরে আজ রাতে আমরা যাচ্ছি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজধানী ব্রাসেলসে। সেখানে আগামীকাল ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সারাদিন বৈঠক রয়েছে। এরপর সাইপ্রাস ও গ্রিস সফর শেষে আগামী সপ্তাহে দেশে ফিরব।
আপনাদের যে কোনো অভিজ্ঞতা, পরামর্শ বা মতামত জানাতে চাইলে ইনবক্স বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে পারেন। আপনাদের কথা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আর শেষে একটি ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা না বললেই নয়।
মতবিনিময় সভা শেষ হওয়ার পর একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হঠাৎ গেয়ে উঠলেন—
"দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়..."
পুরো ঘরটা যেন মুহূর্তেই অন্যরকম হয়ে গেল। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। তখন আবার মনে হলো, আমি বারবার যে কথাটি বলি, সেটিই সত্য— প্রবাসে আমাদের পরিচয় জেলা, থানা বা রাজনৈতিক দল নয়; আমাদের একটাই পরিচয়- আমরা বাংলাদেশের মানুষ।
পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, ভালো থাকুন সব বাংলাদেশি।
ভালো থাকুক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
(শরিফুল হাসান ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান। বর্তমানে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে প্রবাসীদের সাথে দেখা করছেন, তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয় কথা বলছেন। তিনি এই বিরল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত। মাইগ্রেশন কনসার্নকে তিনি এই লেখাগুলো পাঠকের জন্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন।)
logo-1-1740906910.png)