শরিফুল হাসানের কলাম
রোমের পথে পথে অভিবাসী মানুষের গল্প
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৬
ঢাকা আর রোম যখন একই টেবিলে বসে, তখন বোঝা যায়— অভিবাসন শুধু সীমান্তের গল্প নয়, এটি দেশ থেকে দেশ আর মানুষের গল্প। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ইতালির স্টেট পুলিশের সেন্ট্রাল ডিরেক্টরেট অব ইমিগ্রেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আজ দীর্ঘ বৈঠকের পর এই কথাগুলোই ফের উপলব্ধি হলো।
রোমের বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠকের শেষ দিনে আজ সকালেই পুলিশ ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক ছিল। বৈঠকে যোগ দিতে পৌঁছালে পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁদের দপ্তর ও বিভিন্ন শাখার কার্যক্রম ঘুরে দেখালেন। তারা জানালেন এখান থেকেই ইতালিতে থাকা বৈধ ও অনিয়মিত; সব ধরনের অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয় সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশ ডেস্কের সব কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর শুরু হলো প্রায় দেড় ঘণ্টার আলোচনা।
বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া ও ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে অনিয়মিত অভিবাসন কেন এখনো উদ্বেগের বিষয়, কীভাবে নিরাপদ, নিয়মিত ও দক্ষ অভিবাসনের পথ আরো শক্তিশালী করা যায়, বিদেশফেরতদের পুনঃএকত্রীকরণকে কীভাবে আরো কার্যকর করা যায় এবং ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশিরা কীভাবে মূলধারার সমাজের সঙ্গে আরো গভীরভাবে যুক্ত হতে পারেন; এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে।
একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বললেন, অনেক বাংলাদেশি বছরের পর বছর ইতালিতে থেকেও নিজেদের ছোট পরিসরের গণ্ডির বাইরে খুব বেশি বের হতে পারেন না। অথচ ভাষা শেখা, স্থানীয় সংস্কৃতিকে জানা এবং সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া শুধু নাগরিকত্বের পথই সহজ করে না, জীবনের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয়। ইতালিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা বাংলাদেশিরা নতুনদের জন্য এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের সহ-অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘প্রত্যাশা’ এবং ফ্রন্টেক্স উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত পুনঃএকত্রীকরণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছি। বাংলাদেশ, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সহযোগিতা আরও কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
আজকের বৈঠক শেষে আমার উপলব্ধি আরো দৃঢ় হয়েছে—অভিবাসন শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়। এটি আস্থা, অংশীদারত্ব, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং উৎস, গন্তব্য ও প্রত্যাবর্তন; পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াজুড়ে সমন্বিত সহযোগিতার বিষয়।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই Adalgisa Di Brisco, Pierpaolo Zappavigna এবং Andrea Berghella-কে তাঁদের আন্তরিক আতিথেয়তা ও খোলামেলা আলোচনার জন্য। কৃতজ্ঞতা আমার সহকর্মী মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ এবং রকিব আহসান খানের প্রতিও।
আপনারা জানেন, ইতালিতে বর্তমানে তিন থেকে চার লাখের বেশি বাংলাদেশি বাস করেন। ইউরোপে এটি বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ আবাসস্থল। ব্যবসা, সেবা, পরিবহনসহ নানা খাতে তাঁদের শ্রম, মেধা ও উদ্যোক্তা-মানসিকতা ইতালির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
এই প্রবাসীদের কথা শুনতেই আমরা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে ইউরোপ সফরে এসেছি। যাত্রা শুরু হয়েছে রোম থেকে। গতকাল রাতে রোমের কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা ও মতবিনিময় করেছি। আজ ছিল ইতালিয়ান স্টেট পুলিশের সঙ্গে বৈঠক। বৈঠক শেষ করেই আমরা পৌঁছে গেছি স্পেনের বার্সেলোনায়। এরপর আমাদের গন্তব্য পর্তুগাল, সাইপ্রাস ও গ্রিস।
ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ—আপনারা আপনাদের অভিজ্ঞতা, সমস্যা, স্বপ্ন ও পরামর্শ আমাদের জানান। ইনবক্স বা হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা এসেছি আপনাদের কথা শুনতে। কারণ আপনাদের অভিজ্ঞতাই আমাদের ভবিষ্যতের কাজকে আরো কার্যকর ও মানবিক করে তুলবে। ভালো থাকুক সব বাংলাদেশি। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।
(শরিফুল হাসান ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান। বর্তমানে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে প্রবাসীদের সাথে দেখা করছেন, তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয় কথা বলছেন। তিনি এই বিরল অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত। মাইগ্রেশন কনসার্নকে তিনি এই লেখাগুলো পাঠকের জন্য প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন।)
logo-1-1740906910.png)