Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞ কলাম

বাংলাদেশ-লিবিয়া-ইতালি রুটে মানব পাচার অর্থনীতি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:৩৫

বাংলাদেশ-লিবিয়া-ইতালি রুটে মানব পাচার অর্থনীতি

শরীয়তপুরের ইশমাম ঢাকায় তিন বছর নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে প্রায় ৬৫০০ ডলার সঞ্চয় করেছিলেন। এক স্থানীয় দালাল তাকে ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখায়- বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়া, তারপর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি। মাসিক আয় হবে বার্ষিক আয়ের কয়েকগুণ। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছে তিনি বন্দি হন তথাকথিত “গেম হাউসে”, যেখানে শত শত অভিবাসী অনিশ্চিত অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে সমুদ্রযাত্রা শুরু হলেও মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে কোস্টগার্ড তাদের আটক করে।

আরেকজন প্রত্যাগত অভিবাসী জানান, লিবিয়ায় বাংলাদেশি দালালরাই এই নেটওয়ার্ক চালায়। তিনি বলেন, “আমার দালাল ১২ হাজার ৯১৫ ডলার নিয়েছিল ইউরোপে পাঠানোর জন্য, অথচ আমি অপরাধীর মতো দেশে ফিরেছি।” লিবিয়ায় তাকে ২৩ দিন আটক রাখা হয়, পরিবারের কাছ থেকে আরো টাকা আদায়ের জন্য।

২০২২ সালে ইতালিতে এই রুটে পৌঁছান ১৫ হাজার ২২৮ বাংলাদেশি, যা ২০১৮ সালের মাত্র ৩৪৯ জন থেকে বিপুল বৃদ্ধি। ২০২৪ সালে প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি ইতালিতে পৌঁছান। একই সময়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) লিবিয়া থেকে হাজারো বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠায়।

প্রধান পথ হলো বাংলাদেশ থেকে দুবাই হয়ে মিসর, তারপর বেনগাজি। প্রায় অর্ধেক অভিবাসী এখন তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করে। কখনো ভারত ও শ্রীলঙ্কা হয়ে বিকল্প পথও ব্যবহার করা হয়। এভাবে রুটগুলো আইন প্রয়োগের চাপ এড়াতে ক্রমাগত বদলাচ্ছে।

সৌদি আরবে বৈধভাবে যেতে একজন শ্রমিকের খরচ ৪ হাজার ৩৫ থেকে ৭ হাজার ২৬৫ ডলার। মালয়েশিয়ায় যেতে লাগে ২ হাজার ৮২৫ থেকে ৪ হাজার ৮৪৫ ডলার। অথচ সরকারিভাবে নির্ধারিত খরচ এর অর্ধেকেরও কম। অন্যদিকে লিবিয়া-ইতালি রুটে খরচ দাঁড়ায় ১০ থেকে ১৭ হাজার ডলার। দালালরা বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে কয়েক হাজার ডলার নেয়, এরপর ট্রানজিট দেশগুলোতে আরো অর্থ আদায় হয়। লিবিয়ায় পৌঁছে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও কোস্টাল স্মাগলাররা নিরাপত্তা ফি দাবি করে।

লিবিয়ার “গেম হাউস” আসলে বন্দিশালা। এখানে ২০০-৩০০ মানুষকে আটকে রাখা হয়। টাকা শেষ হয়ে গেলে তাদের ফেরত পাঠানো হয়, আর যারা অর্থ দিতে থাকে তারা অপেক্ষায় থাকে। অনেককে জোর করে অন্য নিয়োগকর্তার কাছে “বিক্রি” করা হয়।

লিবিয়ার পাচারকারীদের কাছে বাংলাদেশিরা “গোল্ড” হিসেবে পরিচিত। কারণ তাদের পরিবার সব সময় অর্থ পাঠাতে প্রস্তুত থাকে। গবেষণা বলছে, এই রুটে বছরে ১৬০-১৯০ মিলিয়ন ডলার প্রবাহিত হয়। ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো বাদ দিলেও ২০২৬ সালে বাজারটি ২৫০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আইনসঙ্গত পথের খরচ বাড়ছে, আর উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিয়োগ সীমিত হচ্ছে। ফলে অনেকেই ইউরোপমুখী অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন। ২০২৫ সালে ইতালিতে বাংলাদেশি আগমন দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পাচার অর্থনীতি আরো বিস্তৃত হবে।

বাংলাদেশ-লিবিয়া-ইতালি রুট এখন বিশ্বের অন্যতম লাভজনক মানব পাচার করিডোর। বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় হাজারো মানুষ জীবন ঝুঁকি নিয়ে দালালদের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বৈধ অভিবাসন পথ না খুললে এই চোরাই অর্থনীতি আরো বিস্তৃত হবে।

লেখক: জুলকার নাইম, আইনজীবী ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক

Logo