Logo
×

Follow Us

মতামত

সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের কলাম

কর্পোরেট অবহেলার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের অদৃশ্য শ্রমমূল্য

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৭

কর্পোরেট অবহেলার আড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের অদৃশ্য শ্রমমূল্য

গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) দেশগুলোর ঝলমলে আকাশচুম্বী ভবনগুলো গড়ে উঠেছে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের ঘামে। এতদিন বিশ্বজুড়ে নির্মাণ খাতের ঝুঁকির দিকে বেশি নজর দেওয়া হলেও এখন রাস্তাঘাটে আরো মারাত্মক কিন্তু অদৃশ্য এক সংকট দেখা দিচ্ছে। 

দ্রুতবর্ধনশীল ’গিগ ইকোনমি’র উন্মত্ত প্রতিযোগিতা জবাবদিহি এবং সুনির্দিষ্ট আইন, নীতিমালা বা বিধিমালার আওতায় না আসার কারণে এর সাথে যুক্ত অসংখ্য শ্রমিকের মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনার কোনো দায় নিচ্ছে না।

সমগ্র অঞ্চলে এই বাজারের মূল্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক বাজারের ৭% এর বেশি এবং বছরে প্রায় ১৪% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু দুবাইতেই রোডস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (RTA) এর মতে, প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ডেলিভারি রাইডার শহরের ব্যস্ত সড়কে কাজ করছে। কিন্তু রাইড-হেইলিং ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো স্থানীয় অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি তারা একই সঙ্গে এক প্রাণঘাতী অনিশ্চয়তার ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে।

আমলাতন্ত্রের আড়ালে লুকানো মৃত্যুর সংখ্যা

গালফ অঞ্চলে অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর পরিমাণ ভয়াবহ। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ হাজারের বেশি ভারতীয়, ১৭ হাজার বাংলাদেশি এবং ১০ হাজার নেপালি সেখানে মারা গেছেন। এদের অনেক মৃত্যুকেই কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে “স্বাভাবিক মৃত্যু” বা “কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট” হিসেবে চিহ্নিত করে।

মৃত্যুর এই শ্রেণিবিন্যাস বেশির ভাগই চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি আমলাতান্ত্রিক ঢাল। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১৮ ঘণ্টার কাজ শেষে হঠাৎ মৃত্যুবরণকে “স্বাভাবিক মৃত্যু” বলা হলে নিয়োগকর্তা ও প্ল্যাটফর্মগুলো ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে পারে। ফলে একজন শ্রমিকের মৃত্যু, যেটি একেবারেই মালিকপক্ষের অবহেলাজনিত এবং শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ, সেটি একটি গড়পরতা পরিসংখ্যান হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার পরিবারগুলো তাদের উপার্জনক্ষম সদস্য হারানোর পাশাপাশি আর্থিক ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হয়।

গিগ অর্থনীতি: প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের কাঠামো

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকুইডেমের ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা যায়, গালফে গিগ কাজ মূলত থার্ড-পার্টি লজিস্টিকস (3PL) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা কাফালা ব্যবস্থার অধীনে কাজ করে। এর ফলে প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়োগকর্তার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে, আর মধ্যস্থতাকারীরা (সাপ্লায়ার কোম্পানি) গিগ 

শ্রমিকদের ভিসা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে

এই মডেলটি জোরপূর্বক শ্রমের নির্দেশক। যেমন নিয়োগ ঋণ, বেতন থেকে কাটছাঁট, পাসপোর্ট জব্দ এবং কাজ বন্ধ বা বহিষ্কারের হুমকির মতো বিষয় এই মডেলের সাথে জড়িত। রাইডাররা উচ্চ বা অসহনীয় তাপমাত্রা, সড়ক দুর্ঘটনা, দীর্ঘ সময় ধরে পানিশূন্যতা ইত্যাদি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হয়। তবুও তারা প্রায়ই কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা সংক্রান্ত সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকে। এবং অফ-শিফটে থাকা অবস্থায় রাইডারদের মৃত্যুকে “স্বাভাবিক মৃত্যু” হিসেবে চিহ্নিত হয়। আর এভাবেই মালিকপক্ষ তাদের দায় এড়ানোর জন্য যুতসই যুক্তি পেয়ে যায়।

কাঠামোগত অর্থনৈতিক শোষণ

গিগ অর্থনীতিতে অস্বচ্ছ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ করা হয়, ইচ্ছামতো জরিমানা আরোপ করা হয়, এবং কাজের খরচ শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় – যা অনেক সময় তাদের আয়কে জীবিকা নির্বাহের স্বাভাবিক মাত্রার নিচে নামিয়ে দেয়। একই সঙ্গে, আইনগত বাধার কারণে শ্রমিকদের ফ্রিডম অব অ্যাসোসিয়েশন বা সংগঠনের স্বাধীনতাও কার্যত অসম্ভব। ফলে প্ল্যাটফর্ম, মধ্যস্থতাকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শ্রমিকদের ক্ষতির দায় খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারে।

অ্যালগরিদমিক চাপ ও তাপজনিত ঝুঁকি

গিগ অর্থনীতির একটি বিশেষ “পদ্ধতি” হলো অস্বচ্ছ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষকে অসহনীয় মাত্রায় নির্যাতন করা। সাক্ষাৎকার দেওয়া রাইডাররা জানান, তারা প্রতিদিন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হন। প্ল্যাটফর্মের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে ক্লান্তি ও মরু অঞ্চলের প্রচণ্ড গরমকে উপেক্ষা করতে হয়।

তাদের এই বিপদ অ্যাপ বন্ধ হওয়ার পরও শেষ হয় না। অনেক শ্রমিক বাসস্থানে হঠাৎ মারা যান দীর্ঘ সময়ের পানিশূন্যতা বা কিডনি বিকল হয়ে পড়ে যাওয়ার কারণে। যেহেতু এসব মৃত্যু “ডিউটির সময়ের বাইরে” ঘটে, তাই এগুলো কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য হয় না। অর্থাৎ, সিস্টেমটি শ্রমিকের কাছ থেকে শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে নেয়, কিন্তু মৃত্যু ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তার দায় এড়িয়ে যায়। কেননা কিডনি বিকল হওয়া বা অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণ নির্ধারণের প্রয়োজনকে সুচতুরভাবে আড়াল করা হয়।

ন্যায়বিচার পেতে করণীয় কী?

গালফ অঞ্চলের অভিবাসী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা সাময়িক নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। যদি বাংলাদেশের মতো রেমিট্যান্স-নির্ভর দেশগুলো নিজেদের বৈশ্বিকভাবে স্বচ্ছ, সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চায়, তবে তাদের অভিবাসী শ্রমিকদের “ব্যবসায়িক অংশীদার” নয়, বরং অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

এই অদৃশ্য মৃত্যুর চক্র থামাতে তিনটি পদক্ষেপ অপরিহার্য:

১. স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ: উপসাগরীয় দেশগুলোকে গিগ খাতসহ কর্মসংক্রান্ত মৃত্যুর স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

২. সর্বজনীন বীমা ব্যবস্থা: “কর্মচারী” বা “চুক্তিভিত্তিক” পরিচয় নির্বিশেষে সকল শ্রমিকের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি, কর্মক্ষেত্রের চাপজনিত কারণে অফ-শিফট মৃত্যুর ক্ষেত্রেও।

৩. কর্পোরেট দায়বদ্ধতা: প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় এনে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ তহবিলে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

প্রতিটি “স্বাভাবিক মৃত্যু” সনদের পেছনে রয়েছে একটি শ্রমিকের পরিবারের ভেঙে পড়া ভবিষ্যৎ। মনে রাখতে হবে, ক্ষতিপূরণ কোনো দয়া নয়, এটি মানবিক মর্যাদার ন্যূনতম মূল্য।

লেখক: সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, সিনিয়র রিসার্চার, ইকুইডেম (লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান) 

Logo