হরমুজ প্রণালী নিয়ে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেখতে পারে বিশ্ব
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৫৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর শেষ দিকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বারবার জাহাজে হামলা বা হুমকি দিয়েছে, ফলে প্রণালী দিয়ে চলাচল স্থগিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এই জটিল পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাব্য পথ সামনে এসেছে:
১. আঞ্চলিক একতরফা সামরিক পদক্ষেপ
২. মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক অভিযান
৩. ধাপে ধাপে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান
প্রথম পরিস্থিতি: আঞ্চলিক একতরফা সামরিক পদক্ষেপ
গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের সদস্য রাষ্ট্র ও জর্ডান মিলে স্বাধীন সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রণালী পুনরায় খুলতে পারে। তবে তাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে- নৌবাহিনী, মাইন অপসারণ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ঘাটতি আছে। এতে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বাড়বে। পাকিস্তান বারবার সতর্ক করেছে যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ালে কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় পরিস্থিতি: মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ অভিযান
এখানে গালফ রাষ্ট্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত সামরিক অভিযানে অংশ নেবে। মার্কিন সেনারা তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করবে এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেবে। এটি “coercive diplomacy”-এর কাঠামোর মধ্যে পড়ে, সীমিত শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে আচরণ পরিবর্তনে বাধ্য করা।
তবে ইসরায়েল আলোচনার বিরোধিতা করছে, যা জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী না হয়ে যোগাযোগ রক্ষাকারী কূটনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করবে। সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে সামরিক চাপের পাশাপাশি পাকিস্তানের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা, যাতে ইরান প্রণালী থেকে সরে আসে এবং বিনিময়ে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়।
তৃতীয় পরিস্থিতি: প্রণালী বন্ধ রেখে চাপ সৃষ্টি
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো ইরান প্রণালী বন্ধ রাখবে এবং এটিকে আলোচনায় চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। এটি “coercive bargaining”-এর উদাহরণ, ঝুঁকি ভাগাভাগি করে রাজনৈতিক ছাড় আদায় করা।
২৬ মার্চ ইরান চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক ও পাকিস্তানের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, যা দেখায় তারা বাছাই করে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করছে। এভাবে তারা মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে পুরস্কৃত করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পূর্ণ পুনরায় খোলা রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে।
এখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদে আলোচনার যে ফরম্যাট চলছে, সেটিই ইরানের জন্য মুখরক্ষা করে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও প্রণালী আংশিক খোলার পথ তৈরি করতে পারে।
তিনটি পরিস্থিতি একে অপরকে বাদ দেয় না, বরং একই সংকটের ভেতরে একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে। সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হলো তৃতীয়টি; ইরান প্রণালী বন্ধ রেখে আলোচনায় চাপ সৃষ্টি করবে, আর পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে। প্রথম ও দ্বিতীয় পরিস্থিতি কূটনীতির ব্যর্থতার ওপর নির্ভরশীল এবং উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি অনেক বেশি।
এই সংকটকে শুধু যুদ্ধ ও শান্তির দ্বন্দ্বে ফেলা যায় না। এটি আসলে একটি কাঠামোবদ্ধ দরকষাকষি, যেখানে পারস্পরিক দুর্বলতা, মধ্যস্থতাকারীর উপস্থিতি এবং মুখরক্ষার সুযোগ; সবই আছে, তবে ভঙ্গুর। পাকিস্তানের ভূমিকা, গালফ রাষ্ট্রগুলোর শান্তিপূর্ণ অবস্থান এবং ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে আলোচনার ফাঁক ধীরে ধীরে কমে আসাই টেকসই সমাধানের ভিত্তি হতে পারে।
logo-1-1740906910.png)