যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার সমাপ্তি হয়েছে। গত সোমবার জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত সমাপনী দিনে সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় বইমেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
২২ মে শুরু হওয়া এই সাহিত্য উৎসব উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। প্রথম দিনেই সমবেত সংগীত, নৃত্যানুষ্ঠান, কবিতা পাঠ, আজীবন সম্মাননা এবং মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বজিত সাহাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে বইমেলার সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়।
টানা দুই দিন বৃষ্টিপাত হলেও বইমেলার প্রাণচাঞ্চল্যে ভাটা পড়েনি। বরং বৃষ্টির মধ্যেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে প্রবাসে বাংলা বই ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের গভীর অনুরাগ। বিভিন্ন সেমিনার, সাহিত্য আড্ডা, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, কবিতা পাঠ, নাটক, সংগীতানুষ্ঠান এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা বইমেলাকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
দ্বিতীয় দিনে ‘গদ্যের অন্দরমহল’ শীর্ষক লেখক-পাঠক আড্ডায় অংশ নেন ইমদাদুল হক মিলন, দীপেন ভট্টাচার্য, সাদাত হোসাইনসহ অনেকে। শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন এবং কবিতা পাঠ দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় ‘কলম ও কৌতূহল’ সাহিত্য আলোচনা এবং রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের মঞ্চায়ন। রাতের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অদিতি মহসিনের একক সংগীতানুষ্ঠান।
তৃতীয় দিনে শিশু-কিশোর-যুবাদের চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নতুন বই নিয়ে আলোচনা এবং সমকালীন সাহিত্য নিয়ে বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এদিন মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা ড. আবদুন নূর সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন। ‘চিত্তরঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার’ অর্জন করে বাতিঘর।
সমাপনী দিনে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের মুখোমুখি অনুষ্ঠান দর্শকদের ভিড় জমায়। সাহিত্য, পাঠাভ্যাস, সামাজিক পরিবর্তন ও সৃজনশীলতা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। দিনব্যাপী শিশু-কিশোরদের উৎসব, গল্পলেখার কর্মশালা, সংগীত, নৃত্য ও কবিতা আবৃত্তি বইমেলাকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।
বিশেষভাবে আলোচিত হয় ‘সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। শতাধিক তরুণ সেখানে অংশ নিয়ে সাহিত্য, প্রযুক্তি ও মানবসৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে। তরুণদের অংশগ্রহণে এই সেশনটি বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে ঘোষণা করা হয়, আগামী বছরের ৩৬তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২১ থেকে ২৪ মে ২০২৭। চার দিনের এই বইমেলা আবারো প্রমাণ করেছে— বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত সাংস্কৃতিক বন্ধন হিসেবে বিরাজ করছে।
logo-1-1740906910.png)