ডিভি লটারি পুনরায় চালুর দাবি, মার্কিন আদালতে আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:১৬
যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) কর্মসূচির নিবন্ধন চালুর দাবিতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে। ২০২৭ ও ২০২৮ সালের কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার আগ্রহ জানিয়ে রুশ নাগরিক ইভান ইভাননিকভ এই মামলা করেছেন।
এর কয়েক দিন আগে ডিভি লটারি পুনরায় চালুর বিষয়ে নিম্ন আদালতের দেয়া আদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন দেশটির ফেডারেল আপিল আদালত। নবম মার্কিন সার্কিট কোর্ট অব অ্যাপিলসের তিন বিচারকের একটি প্যানেল সরকারের জরুরি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই স্থগিতাদেশ দেন। এর ফলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ডিভি লটারি কার্যক্রম বন্ধ রাখার সুযোগ পায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তায় থাকা কর্মসূচিটি নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে বিবাদী করা হয়েছে। ইভাননিকভের দাবি, পররাষ্ট্র দপ্তরকে ডিভি-২০২৭ ও ডিভি-২০২৮ কর্মসূচির জন্য নিবন্ধন চা লুকরতে বাধ্য করা হোক। তিনি নিজেও এই দুই কর্মসূচিতে অংশ নিতে চান বলে মামলায় উল্লেখ করেছেন।
এর আগে গত ১৪ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল জেলা আদালত ডিভি-২০২৭ কর্মসূচি পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশ অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধনের সময়সূচি ঘোষণা, ১ নভেম্বর থেকে আবেদন গ্রহণ এবং ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচিত ব্যক্তিদের আবেদন করার যোগ্যতা সম্পর্কেজানানোর কথা ছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে জরুরি ভিত্তিতে তা স্থগিত করার আবেদন জানায়।
গত ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট আপিল আদালত সরকারের সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। এর ফলে নিম্ন আদালতের নির্দেশ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়। আদালতে র পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আগের মামলার বাদী অভিবাসন আইনটির মাধ্যমে সুরক্ষিত স্বার্থের আওতায় পড়ে কি না, তা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বিচারক এন র্যান্ডি স্মিথ পৃথক মতামতে প্রতিষ্ঠানটির সাংবিধানিকভাবে মামলা করার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে আদালত স্পষ্ট করে জানায়, নিবন্ধন চালুনা করার বিষয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের সিদ্ধান্তকে তারা সমর্থন করছে না।
নতুন মামলার বাদী ইভান ইভাননিকভের জন্ম রাশিয়ার মস্কোতে। তার আইনজীবীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি দেশটির হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভিনের স্কুল অব ল থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজস্ব অভিবাসন আইনবিষয়ক চর্চা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা ও গ্রিন কার্ডপেতে আগ্রহীদের আইনি সহায়তা দেন।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ইভাননিকভ বর্তমানে লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাস করছেন এবং ও-১এ শ্রেণির অস্থায়ী কর্মভিসার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থান করছেন। বিশেষ দক্ষতা বা অসাধারণ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য এই ভিসা দেয়া হয়। তার ও-১এ আবেদন ২০২৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুমোদিত এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের অনুমতি রয়েছে একই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
মামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনে বেআইনি বিলম্ব এবং স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, ডিভি কর্মসূচির নিবন্ধন বন্ধ রাখা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে। এছাড়া আদালতের মাধ্যমে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করার আবেদনও জানানো হয়েছে। মামলায় ডিভি-২০২৭ ও ডিভি-২০২৮ উভয় কর্মসূচির জন্য কমপক্ষে ৩০ দিনের নিবন্ধন সময় নির্ধারণ এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া চালু রাখার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। ইভাননিকভের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদনও করবেন।
নতুন মামলার বিষয়ে নিউজউইককে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবেন না। নতুন মামলার শুনানি ও আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে ডিভি-২০২৭ ও ডিভি-২০২৮ কর্মসূচির নিবন্ধন চালুর ভবিষ্যৎ।
এদিকে ডিভি লটারি চালুর দাবিতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া রেড নামের সংস্থার প্রধান কার্টিস মরিসন জানিয়েছেন, তাদের পক্ষ থেকে আরো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। নিউজউইককে তিনি বলেন, ডিভি প্রোগ্রাম পরিচালনায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রেড ইগল দ্রুতই নতুন আইনি উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
আপিল আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ডিভি লটারির নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করতে পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যর্থতাকে আদালত সমর্থন করছে না। তবে মামলাকারী সংস্থা তাদের পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। পাশাপাশি আদালতের মতে, সংস্থাটি এই কর্মসূচির সরাসরি সুবিধাভোগী কিংবা সংশ্লিষ্ট স্বার্থের পক্ষ নয়। তাই এ বিষয়ে মামলা করার আইনি অধিকার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
উল্লেখ্য, ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ তৈরির একটি বিশেষ ব্যবস্থা। যেসব দেশ থেকে ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ভিসা বরাদ্দ রাখা হয়। এটি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রিন কার্ড লটারি নামেও পরিচিত।
১৯৮০-এর দশকে মার্কিন কংগ্রেসে নেয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এই কর্মসূচির সূচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় কম প্রতিনিধিত্ব থাকা দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট অব ১৯৯০-এ স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি স্থায়ীভাবে চালু হয়। ঐতিহাসিকভাবে যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সংখ্যা কম, সেসব দেশের মানুষের জন্য অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
ডিভি কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয় ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, লটারিতে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধনের তারিখ যথাসম্ভব দ্রুত ঘোষণা করা হবে। তবে নিবন্ধন শুরু হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ট্রাম্প প্রশাসন ডাইভারসিটি ভিসা ইস্যু স্থগিতের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকেই কর্মসূচিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
logo-1-1740906910.png)