Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিদেশে চাকরি, নাকি দেশে ব্যবসা?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:১৬

বিদেশে চাকরি, নাকি দেশে ব্যবসা?

বাংলাদেশের অনেক তরুণ বিদেশে চাকরির জন্য পরিবারের সঞ্চয় খরচ করেন, ঋণ নেন, এমনকি জমিজমা বিক্রি করেন। অন্যদিকে একই অর্থ দিয়ে দেশে ব্যবসা শুরু করলে কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। তাহলে কেন অধিকাংশ মানুষ উদ্যোক্তা হওয়ার বদলে বিদেশে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন? যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ দেওয়ানের মতে, এর উত্তর শুধু অর্থের অভাবে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় লুকিয়ে আছে।

লেখকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একটি পরিবার যখন বিদেশে চাকরির জন্য বিনিয়োগ বা দেশে ব্যবসা শুরু করার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা সম্ভাব্য আয়, ঝুঁকি ও ক্ষতির হিসাব করে। বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আয়ের একটি ধারণা আগে থেকেই থাকে। কিন্তু ব্যবসার ক্ষেত্রে বাজার, বিক্রি, পরিচালন ব্যয় এবং লোকসানের ঝুঁকি অনেক বেশি অনিশ্চিত।

এ কারণে অনেক পরিবারের কাছে অভিবাসন তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মনে হয়। বিশেষত সীমিত সঞ্চয় থাকা পরিবারগুলো বড় ধরনের ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী থাকে।

প্রবন্ধে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা পরিবেশকে নিরুৎসাহিত করে এমন ছয়টি বড় সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অর্থপাচার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার, এবং দারিদ্র্যের চক্র।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ দেওয়ানের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। দুর্নীতি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের কারণে ব্যবসার প্রকৃত ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক খরচ উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

অর্থপাচারের বিষয়টিও ব্যবসা পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এতে দেশে বিনিয়োগযোগ্য মূলধন কমে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়া মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে। ব্যাংক ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পান না। যারা নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে।

লেখক উল্লেখ করেছেন, অভিবাসনের পেছনে ব্যয় করা অর্থকে সব সময় দেশের ক্ষতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক ব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে ব্যবসাও শুরু করেন।

তবে দেশের ভেতরে একটি সফল ব্যবসা যে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, তা রেমিট্যান্সের বিকল্প নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে যাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা নয়, বরং দেশে এমন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে উদ্যোক্তা হওয়াও সমানভাবে লাভজনক ও নিরাপদ মনে হবে।

এ জন্য সহজ ব্যবসা নিবন্ধন, স্বচ্ছ লাইসেন্স ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, সাশ্রয়ী ঋণ, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মতো সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।

লেখকের মতে, দেশে বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা হওয়ার পক্ষে শুধু আবেগ বা দেশপ্রেম নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্রয়োজন। যতদিন পর্যন্ত ব্যবসার পথে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো দূর না হবে, ততদিন বিদেশে কর্মসংস্থানের পথই অনেক পরিবারের কাছে বেশি আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে থেকে যাবে।

Logo