রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিক পাচারের প্রমাণ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৫৭
বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশনের মতে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী চক্র প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে যুক্ত করেছে। তাদের অনেককে পরে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতেও পাঠানো হয়েছে।
ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জোরপূর্বক নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের সবাই পুরুষ এবং অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। তাদের উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখানো হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, কারখানা কর্মী, মেকানিক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো।
বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা এমন কিছু ব্যবসায়িক ভিসার কপি পেয়েছেন, যেখানে রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কাগজপত্রে সফরের উদ্দেশ্য বেসামরিক কাজ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে অনেককে সামরিক নিয়োগপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বিদেশি নাগরিককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় হওয়ায় অনেকেই এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি। কারও কারও পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় এবং চলাফেরার স্বাধীনতাও সীমিত করে দেওয়া হয়।
এক ভুক্তভোগী বাংলাদেশির স্ত্রীর সাক্ষ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার স্বামীকে চুক্তিপত্রের বিভিন্ন স্থানে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। পুরো চুক্তি ছিল রুশ ভাষায় এবং তার সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।
কমিশন জানিয়েছে, নিয়োগের পর বিদেশিদের ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। এর ফলে পরিবারগুলো আর্থিক সংকট, ঋণের বোঝা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, অনেক পরিবার চাকরির আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, ঋণ নিয়েছে কিংবা সম্পদ বিক্রি করেছে। পরে স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের খোঁজেও পরিবারগুলো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাচ্ছে না।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন মনে করছে, চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া এবং জোর করে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো মানব পাচারের শামিল। সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে কমিশন রাশিয়ার বিরুদ্ধে মানব পাচার ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ চিহ্নিত করেছে।
কমিশন রাশিয়াকে এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং প্রতারণামূলক নিয়োগ ঠেকাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর বিষয়টি এর আগেও আলোচনায় আসে। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত কয়েক ডজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। অনেক পরিবার এখনো তাদের স্বজনের খোঁজে অপেক্ষায় আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে কোনো প্রস্তাব গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই, সরকারি অনুমোদিত মাধ্যমে বিদেশযাত্রা এবং দূতাবাস ও সরকারি সংস্থার তথ্য অনুসরণ করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি।
logo-1-1740906910.png)