Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিদেশের কারাগারে বন্দি ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৪

বিদেশের কারাগারে বন্দি ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি

বিদেশের ভূখণ্ডে অভিবাসন আইন লঙ্ঘন, প্রতারণা কিংবা অপরাধমূলক মামলায় জড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন অন্তত ১৫ হাজার ২১৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সংগৃহীত হালনাগাদ ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে শীর্ষ দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে এই উদ্বেগজনক চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। 

সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আটক রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোতে। এর মধ্যে একক দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে আটক আছেন অন্তত ৭ হাজার ৫০০ জন (যার মধ্যে কেবল জেদ্দা ও রিয়াদেই ৫,৪৮০ জন)। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে মালয়েশিয়া (২,২১৭ জন) এবং ভারত (১,৪৪৪ জন)।

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ৭৪০ জন, ওমানে ৪০০, লিবিয়ায় ৩১৪, গ্রিসে ৩০৭, কুয়েতে ২৯৬, ভিয়েতনামে ২৫০ এবং থাইল্যান্ডের কারাগারে ১২৭ জন বাংলাদেশি নাগরিক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে থাইল্যান্ডের কারাগারে মানব পাচারের শিকার হওয়া এবং লাওস-কম্বোডিয়া হয়ে থাই সীমান্তে বন্দি থাকা ৪১ বছর বয়সী আমজাদ হোসেনের মতো শত শত প্রবাসীর পরিবার প্রিয়জনকে জীবিত ফেরত পেতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আকুতি জানাচ্ছেন। তবে স্থানীয় দূতাবাসগুলো থেকে তথ্য না পাওয়া এবং বিলম্বিত আইনি প্রক্রিয়ার কারণে স্বজনদের মাঝে গভীর ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো থেকে আটক প্রবাসীদের প্রতি পর্যাপ্ত কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি কনস্যুলার কার্যক্রমের ঘাটতিকে নতুন করে সামনে এনেছে। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের তথ্য অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্তদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পূর্বে সৌদি কর্তৃপক্ষ মিশনকে আগাম কোনো প্রশাসনিক বার্তা বা রায়ের অনুলিপি সরবরাহ করেনি। তালিকা হাতে পাওয়ার পর থেকে কার্যকর হওয়া পর্যন্ত এই দুই সপ্তাহে মিশন কতটুকু আইনি ফলোআপ করেছিল, তা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ' গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ভারত ও থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কূটনৈতিক ও শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় আইনি জটিলতা সত্ত্বেও তারা নিয়মিত ডিটেনশন সেন্টার বা কারাগার পরিদর্শন করছেন। মালয়েশিয়ায় আটক প্রবাসীদের ৭০ শতাংশই ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সংক্রান্ত অভিবাসন অপরাধে অভিযুক্ত, যা নিরসনে স্থানীয় আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সৌদি আরবে নিয়োগকর্তা বা 'কফিল' কর্তৃক অর্থ আত্মসাতের মিথ্যা মামলায় প্রবাসীদের ফাঁসানুর হার বেশি বলে মিশন জানিয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে জানান, বিদেশে প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করা মিশনের শ্রম উইংগুলোর মূল দায়িত্ব। অবহেলার শিকার কোনো প্রবাসী বা পরিবার সরাসরি মন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ পাঠালে তা ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন তিনি। এছাড়া, বিদেশের কারাগারে বন্দি নাগরিকদের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, সাজার মেয়াদ তদারকি ও দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সর্বাধুনিক ‘অনলাইন ডেটাবেজ বা পোর্টাল’ তৈরির কাজ শুরু করেছে। এতে প্রবাসীর জাতীয় পরিচয়পত্র, সাজার মেয়াদ ও আইনি তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং মেয়াদের শেষ ছয় মাসে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা দেবে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, বিদেশে আটক প্রবাসীদের ফৌজদারি অপরাধ এবং কেবল নথি সংক্রান্ত অভিবাসন জটিলতা; এই দুই ভাগে আলাদা মূল্যায়ন করে আইনি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সাথে দালালের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব হয়ে বিদেশে যাওয়ার আগে প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি ও সামাজিক নিয়মাবলি সম্পর্কে কার্যকর প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের কেবল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি না ভেবে বিপদের দিনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে মিশনগুলোকে তাদের আইনি সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

Logo