মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সৌদিগামী কর্মী নিয়োগে বড় ধস
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৩
আঞ্চলিক সংঘাত, ড্রোন-মিসাইল হামলা ও ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারে। বিশেষ করে দেশের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নতুন কর্মী যাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিদেশে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন কর্মী, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে।
একক দেশ হিসেবে সৌদি আরবে কর্মী গমন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে দেশটিতে যেখানে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন কর্মী গিয়েছিলেন, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা ৪৫.৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সীমান্ত উত্তেজনার ফলে একদিকে প্রবাসী কর্মীরা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে রিয়াদ ও দাম্মামসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট বাতিলের কারণে ছুটি কাটাতে দেশে আসা অন্তত ২০ হাজার কর্মী কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। বহু কর্মী অতিরিক্ত বিমান ভাড়া দিয়ে বিকল্প উপায়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ওপর নতুন করে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশই মাত্র পাঁচটি দেশে গেছেন এবং ৯৪ শতাংশ গেছেন ১০টি নির্দিষ্ট দেশে। বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি না হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এসব বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলছে।
একই সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনের মতো বৃহৎ বাজারগুলো নানা কারণে বন্ধ বা অতিমাত্রায় সীমিত অবস্থায় রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অতি সম্প্রতি ইরানের হামলার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানোর দায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির অভিযোগে ২০২৪ সালের জুন থেকে সাধারণ শ্রমবাজার স্থগিত রয়েছে।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপানের সাথে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসংস্থান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার অধীনে ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে দক্ষ কর্মী পাঠানো শুরু হবে। এছাড়া মালয়েশিয়ায় নতুন করে বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর সরকারি প্রচেষ্টা ও দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানিতে চালক নিয়োগের কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নীতিগত ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে সরকারকে চাহিদাকেন্দ্রিক কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ প্রদান, দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনিক কঠোরতা, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় বিকল্প আইনি চলাচলের পথ (Mobility Corridors) উন্মোচন এবং প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় মিশনগুলোর কনস্যুলার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
logo-1-1740906910.png)