রেমিট্যান্সের জোরে শক্তিশালী হচ্ছে অর্থনীতি, বাড়ছে রিজার্ভ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৬
দেশের অর্থনীতিতে আবারো প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এর আগের মাস জুলাইয়ে আসে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবাহ প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগস্ট শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রেমিট্যান্সের ডলার ব্যাংকে অলস পড়ে থাকে না। এর বড় অংশ ব্যবহার হয় আমদানির বিল পরিশোধে। পাশাপাশি কিছু অংশ আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
প্রবাসী আয় দেশে এলে ব্যাংক সেটিকে টাকায় রূপান্তর করে গ্রাহকের হাতে দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাংকের হিসাবে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ যুক্ত হয়। পরে সেই ডলার আমদানিকারকদের এলসি পরিশোধ অথবা অন্যান্য বৈদেশিক দায় মেটাতে কাজে লাগে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ডলার থাকলে তারা অন্য ব্যাংকের কাছে তা বিক্রি করে। আর বাজারে ডলারের সরবরাহ বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে রিজার্ভে যুক্ত করে।
সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনাও ঘটেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক চারটি ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কিনেছে। এর মাধ্যমে বাজারের উদ্বৃত্ত ডলার রিজার্ভে যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার বাজারে ডলার বিক্রিও করে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রায় ১৪ মাস পর উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই ক্রয়-বিক্রয় নীতির কারণে বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে।
রেমিট্যান্স বাড়লেও একই সময়ে আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের আমদানি বিল দাঁড়িয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। শুধু জ্বালানি আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ১৩৭ কোটি ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় ৮৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে জুলাই মাসে রপ্তানি আয় সামান্য কমে ৪৩৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। ফলে রেমিট্যান্স থেকে আসা অতিরিক্ত ডলারের একটি বড় অংশ আমদানি ব্যয় মেটাতেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে। জুলাইয়ে সামান্য কমলেও আগস্টে আবার রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স যত বাড়ছে, তার পুরোটাই রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে না। কারণ একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দায়ও পরিশোধ করা হচ্ছে। তবুও উদ্বৃত্ত অংশ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হক মনে করেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য নয়, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, রেমিট্যান্স যদি শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থানমুখী খাতে প্রবাহিত করা যায়, তাহলে তা দেশের অর্থনীতির ভিত্তি আরো মজবুত করবে।
logo-1-1740906910.png)