বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বড় একটি অংশ এখনো আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। গবেষণা ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের প্রায় ৭১ শতাংশের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশই আধাদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রেণিভুক্ত।
রামরুর ‘বাংলাদেশ হতে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৫: অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শ্রম অভিবাসন এখনো মূলত আধাদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ কর্মীনির্ভর। ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী ছিলেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি টিটিসি কিংবা বেসরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না নিয়েই বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অধিকাংশ কর্মী। চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণহীন কর্মীর হার ৯২ শতাংশ, রাজশাহী ও রংপুরে ৮৪ শতাংশ এবং ঢাকায় ৮৩ শতাংশ।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, টিটিসিতে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থীর মূল লক্ষ্য বিদেশে যাওয়া নয়। প্রায় ৭৯ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ নেন, আর বিদেশে চাকরির উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ নেন মাত্র ৩৮ শতাংশের কাছাকাছি। এতে প্রশিক্ষণব্যবস্থার সঙ্গে বিদেশমুখী কর্মসংস্থানের সরাসরি সংযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা প্রশিক্ষকসংকট। ৪০টি টিটিসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গড়ে ৭৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে প্রায় ৩৬টি পদ শূন্য। শুধু প্রশিক্ষকের ক্ষেত্রেই গড়ে ২১টি পদ খালি রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে একজন প্রশিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের মতো নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য শুধু কারিগরি দক্ষতা যথেষ্ট নয়। ভাষা, পেশাভিত্তিক দক্ষতা, নিরাপত্তাবিষয়ক জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদের প্রয়োজন হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে কর্মী নিয়োগের আগে ভাষা ও দক্ষতার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ উদ্যোগও দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশগামী অনেক কর্মী এখনো ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী কর্মীদের মধ্যে বিদেশে গিয়ে ভাষা শেখার প্রবণতা বেশি। কিন্তু আধুনিক শ্রমবাজারে যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা বোঝার সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রায় ১৭৫টি দেশে গেলেও মোট কর্মীর ৯৪ শতাংশ মাত্র সাতটি প্রধান শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান পান। ফলে শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মানের সনদ এবং তথ্যভিত্তিক কর্মী ব্যবস্থাপনা চালু না হলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, তা নয়; তারা কতটা দক্ষ, কী ধরনের কাজ করছেন এবং কতটা ভালো মজুরি পাচ্ছেন, ভবিষ্যতে সেই সূচকই বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
logo-1-1740906910.png)