চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বাসিন্দা উজ্জ্বল হোসেন ছোট ভাই আরিফুলকে ইতালি পাঠানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০২২ সালে স্থানীয় মহাজন ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তিনি দালাল সেলিম রেজাকে টাকা দেন। সেলিম লিবিয়ায় থাকতেন এবং ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। উজ্জ্বল দেন ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
আরিফুল মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিমানে ওঠেন। কিন্তু লিবিয়ার বেনগাজি হয়ে ত্রিপোলিতে গিয়ে তিনি মানব পাচারকারীদের হাতে বিক্রি হয়ে যান। জানালাহীন কক্ষে আটকে রেখে তাকে নির্যাতন করা হয়। ভিডিও পাঠিয়ে পরিবার থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়।
ভাইকে বাঁচাতে উজ্জ্বল জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন। ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেন। এরপর পাচারকারীরা উজ্জ্বলের বাবা ইজাল উদ্দিনকে অপহরণ করে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ইজাল লিবিয়ায় কাজ করছিলেন। তাকে নির্যাতন করে আরো ১০ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ইজাল দেশে ফেরেন, কিন্তু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
ইজাল আদালতে জবানবন্দি দিয়ে বলেন, সেলিম রেজা তাকে আটকে রেখে মারধর করেছে, দাঁত ভেঙে দিয়েছে। তিনি চান সেলিমের শাস্তি হোক।
শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের শেষ দিকে আরিফুল আরেক চক্রের সহায়তায় ৫ লাখ টাকা দিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছান। কিন্তু পরিবার এখনো ঋণের বোঝায় ডুবে আছে। প্রতি মাসে মহাজনদের ১ থেকে দেড় লাখ টাকা শোধ করতে হয়।
উজ্জ্বল গত বছরের জুলাইয়ে আদালতে মামলা করেন। সেলিম, তার স্ত্রী সোনিয়া, আলেয়া খাতুন ও আমির আলীকে আসামি করা হয়। তদন্তে সিআইডি অভিযোগের সত্যতা পায়। উজ্জ্বল যে ২৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন, তার একটি অংশ আলেয়া ও আমিরের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছিল।
সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়, তার স্ত্রী আত্মসমর্পণ করেন। দুজন জামিনে আছেন, অপর দুই আসামি পলাতক।
আরিফুলের দুর্ভোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত বছর আলমডাঙ্গার জুনাইদ হাসান প্লাবন লিবিয়ার আটককেন্দ্রে নির্যাতনে মারা যান। তাকে ইউরোপে পাঠাতে পরিবার দিয়েছিল ৪২ লাখ টাকা।
লিবিয়ার মাটিতে বিপদ শেষ হয় না। বছরের পর বছর ধরে ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের মৃত্যু থামছে না। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। শুধু ২০২৫ সালেই প্রবেশ করেছেন ২০ হাজারের বেশি।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে লিবিয়া থেকে ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ইতালি এবং ৩ হাজারের বেশি গ্রিসে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন।
ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, ফিরে আসা অভিবাসীদের ৭৫ শতাংশ প্রতিশ্রুত কাজ পাননি। ৯৩ শতাংশকে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল, ৭৯ শতাংশ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৬৯ শতাংশের চলাফেরার স্বাধীনতা ছিল না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মে পর্যন্ত মানব পাচারের ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা অনিষ্পন্ন ছিল। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার তদন্তাধীন এবং তিন হাজার বিচারাধীন। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন মামলা হয়েছে ৫০০’র বেশি, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। ব্র্যাক বলছে, এখনো কোনো মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। বরং অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন। ফলে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমছে না, বরং বাড়ছে।
logo-1-1740906910.png)