Logo
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বিয়ের নামে নারীদের চীনে পাচার: ভয়াবহ চক্রের চিত্র

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৯

বিয়ের নামে নারীদের চীনে পাচার: ভয়াবহ চক্রের চিত্র

বাংলাদেশি নারীদের বিয়ের নামে চীনে পাচারের ঘটনা ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ১৯ বছর বয়সী রিমা (ছদ্মনাম) নামের এক তরুণী ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তিন বছরের সন্তানের খরচ চালাতে গৃহকর্মীর কাজের খোঁজে ঢাকায় আসা রিমা প্রতারণা, মাদক এবং জোরপূর্বক বিয়ের ফাঁদে পড়ে চীনে পাচার হন। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থা দ্য ডেইলি স্টারের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব ভয়াবহ তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় রিমাকে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনেন। কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় না নিয়ে উত্তর বাড্ডায় একটি ফ্ল্যাটে রাখা হয়। সেখানে তাকে জোর করে ইয়াবা সেবনে বাধ্য করা হয়। পরে মাদক নির্ভরশীল হয়ে পড়লে তার ভিডিও ব্যবহার করে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দিতে বাধ্য করা হয়।

বাংলাদেশি দালাল ‘আদর’ তাকে যমুনা ফিউচার পার্কে নিয়ে চীনা নাগরিক ওয়াং জেন জেনের সঙ্গে পরিচয় করান। এরপর পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যবস্থা করে তাকে চীনে পাঠানো হয়। শুরুতে ভালো ব্যবহার করা হলেও পরে তাকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করা হয়। প্রায় ২০ দিন ধরে তাকে আটকে রেখে মারধর ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়।

রিমার দাবি, তার চীনা স্বামী দালালকে আড়াই লাখ টাকা দিয়েছেন। অন্যদিকে তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য পাচারকারীরা তার পরিবারের কাছে সাড়ে তিন লাখ টাকা দাবি করেছে। একদিন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় সুযোগ বুঝে পালিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর সহায়তায় দেশে ফেরেন।

রিমার মা খুলনার মানব পাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। এতে বাংলাদেশি দালাল ও চীনা নাগরিকসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় প্রতারণা, জোরপূর্বক মাদক সেবন, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক বিয়ে এবং পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিআইডির মানব পাচার ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে চীনকেন্দ্রিক চারটি মানব পাচারের মামলা তদন্তাধীন। বিমানবন্দর, গাবতলী, উত্তরা ও অন্যান্য থানায়ও এ ধরনের মামলা হয়েছে। চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ১,১০০-এর বেশি ফ্যামিলি ভিসা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৬০০ জন নারী ইতোমধ্যে চীনে গেছেন।

ঢাকায় চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, তারা ফ্যামিলি ভিসার আবেদনকারীদের বিয়ের সত্যতা যাচাই করে। তবে মানব পাচারের বেশির ভাগ অভিযোগ সরকারি সংস্থার বদলে গণমাধ্যম থেকেই পাওয়া যায়। দূতাবাসের কাউন্সেলর চু গুয়াং বলেন, এসব ঘটনার পেছনে বাংলাদেশি ও চীনা দালালরা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

ব্র্যাক মাইগ্রেশনের শরিফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশি নারীদের বিয়ে করতে ইচ্ছুক চীনা নাগরিকদের পরিচয় ও বৈবাহিক অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কতজন নারী চীনে গেছেন, ফিরেছেন বা সেখানে রয়েছেন এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন ও পুলিশকে খোঁজ নিতে হবে।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারিকুল ইসলাম বলেন, রিমার ফিরে আসার ঘটনা প্রমাণ করে যে এ ধরনের অপরাধ দমনে দ্রুত আন্তসীমান্ত সহযোগিতা, গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সচেতন করা প্রয়োজন।

বিয়ের নামে মানবপাচার এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতারণা, মাদক এবং দালালের ফাঁদে পড়ে তরুণীরা চীনে পাচার হচ্ছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এ অপরাধ দমন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নারীদের সচেতনতা বাড়ানো এবং ভিসা ও বিয়ের কাগজপত্র যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

Logo