বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় যাওয়া হাজারো নারী প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শোষণ এবং প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দৈনিক ইত্তেফাকের এর প্রতিবেদন বলছে, একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে।
নারী পাচারের অন্যতম কৌশল হয়ে উঠেছে প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল, তারা প্রেম ও বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করে দুই নারীকে চীনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে একই ধরনের অভিযোগে আরো দুই চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার হন। তদন্তে জানা যায়, বিদেশি নাগরিকরা স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামের নারীদের সঙ্গে পরিচিত হন। কয়েক মাস যোগাযোগের পর বাংলাদেশে এসে পরিবারের আস্থা অর্জন করেন এবং বিয়ের মাধ্যমে তাদের বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেক নারীকে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
চাকরির প্রলোভনও নারী পাচারের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি কম্বোডিয়া থেকে ফিরে এক নারী মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, মাসে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে তাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও অর্থ কেড়ে নেওয়া হয় এবং একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে তাকে নির্যাতন ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। পরে তিনি পালিয়ে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় দেশে ফেরেন।
একই ধরনের অভিযোগ সৌদি আরব থেকেও এসেছে। সেখানে এক নারীকে চাকরির প্রলোভনে পাঠানো হলেও পরে তাকে আটকে রেখে মারধর, খাদ্যবঞ্চনা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য যাচাই করা জরুরি। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীদের দ্রুত আইনি ও কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রেম, বিয়ে কিংবা চাকরির প্রলোভনে নারী পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দূতাবাস ও অভিবাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান জানিয়েছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে নারীদের ভিসা, চাকরি নিয়োগদাতা এবং বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে নারী পাচার এখন বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সাত বছরে ৭০ হাজার নারী কর্মীর দেশে ফিরে আসা প্রমাণ করে, এই সমস্যা মোকাবিলায় জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
logo-1-1740906910.png)