বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের শিকার হয়ে শূন্যহাতে দেশে ফিরছেন। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশের জেলখানা বা বন্দিশালা থেকে ডিপোর্টি হিসেবে দেশে ফেরেন। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এভাবে সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেশে ফিরেছেন। এর বাইরে সাগরপথে বিদেশে যেতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
মানব পাচার প্রতিরোধে সরকার ২০১২ সালে আইন প্রণয়ন করলেও মামলার বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। অধিকাংশ মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, আর যেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়, সেগুলোতে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানব পাচার আইনে মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নতুন করে ৫০০টির বেশি মামলা হয়েছে, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। ২০২৫ সালে বা এ বছর এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির পাওয়া যায়নি।
এদিকে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে সরকার সম্প্রতি ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অভিবাসী চোরাচালানকেও আইনের আওতায় আনা হয়েছে। একক ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, নতুন আইনটি যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, দাসত্বসহ গুরুতর পাচারের শিকারদের জন্য আরও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে বাংলাদেশের আইন কাঠামোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।
তবে শুধু আইন করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, “মানব পাচার বা অভিবাসী চোরাচালান দমন করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার ও সাইবার স্ক্যামের ক্ষেত্রে। পাচারের ঘটনায় মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। মানব পাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একসঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ হবে। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃঢ় অঙ্গীকার ছাড়া মানব পাচার, অর্থ পাচার ও মাদকের মতো আন্তঃসম্পর্কিত অপরাধ নির্মূল করা কঠিন।”
অতএব, প্রতি বছর লাখো মানুষ শূন্যহাতে দেশে ফিরলেও মানব পাচারের মামলায় বিচার না হওয়া একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন আইন প্রণয়ন সত্ত্বেও কার্যকর বাস্তবায়ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া মানব পাচার প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
logo-1-1740906910.png)