"এই প্রথম কেউ আমাদের কথা শুনতে এলো"— রোম প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই কথাগুলো আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। গতকাল রাতে রোমে প্রবাসী বাংলাদেশি ও কমিউনিটির কয়েকজন সদস্য যখন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, বাংলাদেশ থেকে কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এই প্রথম আমাদের কথা শুনতে এলো তখন আমরাও আপ্লুত হয়েছি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ও ইতালির বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা হলো।
আপনারা জানেন, ইউরোপে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় আবাসস্থলগুলোর একটি রোম। ইতালিতে বর্তমানে তিন থেকে চার লাখের বেশি বাংলাদেশি বাস করেন, যাদের বড় একটি অংশ রোম ও আশপাশে। ব্যবসা, সেবা, পরিবহনসহ নানা খাতে তাঁদের শ্রম, মেধা ও উদ্যোগ ইতালির অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছে।
এই প্রবাসীদের কথা শুনতেই আমরা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একটি প্রতিনিধিদল রোমে এসেছি। গতরাতে একটি রেস্তোরাঁয় কমিউনিটি নেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ মতবিনিময় করেছি। আমরা শুনতে চেয়েছি, আর তাঁরা অকপটে তাঁদের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের কথা বলেছেন।
কথা বলতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাসরত অনেকেই ব্র্যাককে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশি কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ইতালির বাংলাদেশি ডায়াসপোরা কমিউনিটির সঙ্গে এমন সরাসরি মতবিনিময় সম্ভবত এই প্রথম।
কেউ কেউ সিরিয়িসলি বললেন, "রোমে ব্র্যাকের অফিস খুলুন আর আড়ংয়েরও একটি শাখা হোক এখানে। কারণ তিন থেকে চার লাখ বাংলাদেশি এখানে আছেন। তারা আড়ং থেকে দেশের পোশাক কিনতে চান।
এছাড়া আলোচনায় নিরাপদ অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন, ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, ইতালির আইন, সংস্কৃতি ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে প্রস্তুতি, ডায়াসপোরার ভূমিকা এবং সাগরপথে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন; সবই উঠে এসেছে।
আমরা জানিয়েছি, গত এক দশক ধরে ব্র্যাক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অভিবাসন নিয়ে কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্র্যাকের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রত্যাশা প্রকল্পের মাধ্যমে ইউরোপ ও লিবিয়া থেকে দেশে ফিরে আসা অভিবাসীদের কাউন্সেলিং, রেফারেল, দক্ষতা উন্নয়ন ও টেকসই পুনর্বাসনে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন সেবার বিষয়েও তাঁদের জানিয়েছি।
ডায়াসপোরা সদস্যরা তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, পেশাগত নেটওয়ার্ক ও বিনিয়োগকে বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ব্র্যাক ও ইতালির বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও সবাই গুরুত্ব দিয়েছেন।
মতবিনিময় সভায় আমরা একটি বিষয় বিশেষভাবে তুলে ধরেছি। গত এক দশকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশকারী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ দেশ। এটি কোনো গর্বের বিষয় নয়; বরং গভীর উদ্বেগের। এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। গোটা পৃথিবীর বিনিময়েও একজন মানুষের জীবন ফিরে পাওয়া যায় না। তাই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বন্ধ করতে হবে। নিরাপদ, দক্ষতাভিত্তিক ও নিয়মিত অভিবাসনের কোনো বিকল্প নেই।
আপনারা জানেন, ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কথা শুনতেই আমরা এই সফরে বের হয়েছি। যাত্রা শুরু হয়েছে রোম থেকে। আমার সঙ্গে আছেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ এবং সিনিয়র ম্যানেজার রাকিব আহসান খান। এরই মধ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আজ ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে। এরপর আমাদের গন্তব্য স্পেন, সাইপ্রাস ও গ্রিস।
logo-1-1740906910.png)