বিদেশ পাঠানোর নামে সিন্ডিকেট: কীভাবে কাজ করে, কারা লাভবান?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১০:১২
বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের সিন্ডিকেট আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। রিক্রুটিং এজেন্সি, স্থানীয় দালাল ও ট্রানজিট হ্যান্ডলারদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই চক্র প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারণার কৌশল, অর্থপ্রবাহ এবং আইনি প্রতিকার নিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি একটি সুসংগঠিত ব্যবসায়িক মডেল, যেখানে লাভবান হয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ শ্রমিকরা।
প্রথম ধাপে স্থানীয় দালালরা গ্রাম বা শহরের সাধারণ মানুষকে বিদেশে চাকরির লোভ দেখায়। তারা বলে, অল্প খরচে ভালো বেতনের কাজ পাওয়া যাবে। অনেক সময় ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে প্রার্থীদের বিশ্বাস অর্জন করে। এরপর রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। এজেন্সি কাগজপত্র তৈরি করে, অনেক সময় জাল নথি ব্যবহার করে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপে ট্রানজিট হ্যান্ডলাররা সক্রিয় হয়। তারা বিমানবন্দর বা সীমান্ত এলাকায় ভুক্তভোগীদের নিয়ে যায় এবং অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এভাবে পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপে কমিশন ভাগাভাগি হয়। দালাল, এজেন্সি ও ট্রানজিট হ্যান্ডলার; সবাই লাভবান হয়, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্রমিকরা।
প্রবাসীদের কাছ থেকে আদায় করা ফি সাধারণত কয়েক ধাপে ভাগ হয়। স্থানীয় দালালরা প্রথমে টাকা নেয়, পরে এজেন্সি ও ট্রানজিট হ্যান্ডলারদের কাছে যায়। অনেক সময় বিদেশে পৌঁছানোর পরও নিয়োগকর্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। ফলে শ্রমিকরা দ্বিগুণ ক্ষতির শিকার হন। এই অর্থপ্রবাহের একটি বড় অংশ গোপন কমিশন হিসেবে ভাগাভাগি হয়, যা প্রমাণ করা কঠিন হলেও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট।
সিন্ডিকেটের আরেকটি বড় অস্ত্র হলো কাগজপত্র জালিয়াতি। অনেক সময় ভুয়া ভিসা, ভুয়া নিয়োগপত্র বা জাল মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো হয়। এতে তারা বিদেশে গিয়ে চাকরি না পেয়ে বিপদে পড়েন। অনেকেই অবৈধভাবে অবস্থান করতে বাধ্য হন, যা পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার ও ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রতারিত হলে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন হলো বিদেশগমন আইন ২০১৩ (Migration Law 2013) এবং Emigration Ordinance, 1982। পাশাপাশি চুক্তি আইন ১৮৭২ (Contract Act, 1872) এবং দণ্ডবিধির প্রতারণা ধারায় মামলা করা যায়। এসব আইনের আওতায় প্রতারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তবে বাস্তবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পান বা প্রমাণের অভাবে ন্যায়বিচার পান না।
বিদেশে চাকরির আশায় অনেকেই সর্বস্ব বিক্রি করে দেন। জমি, বাড়ি বা গহনা বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেন। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন নিঃস্ব অবস্থায়। এতে পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দেয়, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এবং মানসিক চাপ তৈরি হয়। ফলে শুধু শ্রমিক নয়, তাদের পরিবারও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশগমন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকায় সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারিত হয়। অনেক সময় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এজেন্সি কাজ করে। দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে না থাকায় প্রতারণা বেড়েই চলেছে। তারা মনে করেন, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।
বিদেশ পাঠানোর নামে সিন্ডিকেটের এসব কার্যক্রম প্রবাসীদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সি, স্থানীয় দালাল ও ট্রানজিট হ্যান্ডলারদের গোপন কমিশন চক্রে সর্বস্ব হারাচ্ছেন শ্রমিকরা। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সরকারি নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এই প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অন্যথায় দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস প্রবাসী শ্রমিকরা অবিরাম ঝুঁকির মুখে পড়তে থাকবে।
logo-1-1740906910.png)