পটুয়াখালীর লিজা আক্তার কিংবা মৌলভীবাজারের রিজিয়া বেগম; দুজনের গল্পই একই রকম। ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসেছেন নিপীড়নের শিকার হয়ে। লিজা সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে চারবার হাতবদল হয়েছেন এবং অমানবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তিনি দেশে ফিরেছেন। অন্যদিকে রিজিয়া বেগম প্রায় পাঁচ বছর নিখোঁজ ছিলেন। অসুস্থ হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ঢাকার বিমানবন্দরে উদ্ধার হওয়ার পরই তার পরিচয় শনাক্ত হয়।
এমন গল্প শুধু তাদের নয়, হাজারো নারীর। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের হিসাব বলছে, গত সাত বছরেই অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন, যাদের অধিকাংশই নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। এর বাইরে অন্তত ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানব পাচারের শিকার হয়েছেন।
নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবার নারী কর্মীরা বিদেশে যান। তবে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর থেকে নারী কর্মী পাঠানো ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। গত এক দশকে প্রায় পাঁচ লাখ নারী সৌদি আরবে গিয়েছেন। অনেকেই পরিবারের ভাগ্য বদলেছেন, আবার অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন।
ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছেন, তাদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। নিয়মিত বেতন দেওয়া হয়নি, পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয়নি, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করানো হয়েছে। কেউ কেউ প্রতিবাদ করায় ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছেন। যশোরের এক নারী জানিয়েছেন, গৃহকর্তা ও তার ছেলে মিলে তাকে যৌন নির্যাতন করেছে। মানিকগঞ্জের এক নারী নির্যাতনের কারণে চারতলা থেকে লাফিয়ে পড়েছেন। কুমিল্লার এক নারীকে মাথায় আঘাত করে ১৪টি সেলাই দিতে হয়েছে।
শুধু সৌদি আরব নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দুবাই, সার্বিয়া; বিভিন্ন দেশে নারী কর্মীরা মানব পাচার ও জোরপূর্বক যৌনপেশায় যুক্ত হওয়ার মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের সাহারা বেগম তার ১৭ বছরের মেয়েকে দুবাই পাঠিয়েছিলেন পরিচ্ছন্নতার কাজের জন্য। সেখানে গিয়ে মেয়েটি নির্যাতনের শিকার হয়। নোয়াখালীর পহেলী আক্তারকে বিউটি পার্লারের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নাইট ক্লাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। গাজীপুরের ইতি আক্তার সার্বিয়ায় গিয়ে চার মাস বন্দি থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশনের গবেষণা বলছে, সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা নারীদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৪ শতাংশ নিয়মিত বেতন পাননি। অনেকেই পর্যাপ্ত খাবারও পাননি। দূতাবাসের সেফ হাউসে আশ্রয় নেওয়া নারীর সংখ্যা বাড়ছে। সৌদি দূতাবাসের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিদিন তিন-চারজন নারী অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো মৃত্যুর ঘটনা। গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অধিকাংশের মৃত্যু সনদে আত্মহত্যা লেখা থাকলেও পরিবারগুলো বলছে, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে নির্যাতনের গল্প আছে। যেমন ২০১৭ সালে সৌদি আরবে গৃহকর্তার নির্যাতনে নিহত হন আবিরুন বেগম। তার মৃত্যুর সনদে হত্যা লেখা থাকলেও কোনো বিচার হয়নি। একইভাবে নাজমা নামে এক নারী হাসপাতালে চাকরির প্রলোভনে সৌদি আরবে গিয়ে বাসাবাড়িতে কাজ করতে বাধ্য হন এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
এমন বাস্তবতায় ৮ মার্চ পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- “অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক।” অর্থাৎ দেশে থাকা নারীদের পাশাপাশি প্রবাসে থাকা নারীদেরও অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, মানবিক আচরণ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে ভাগ্য বদলের স্বপ্নে প্রবাসে যাওয়া নারীদের জীবন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
logo-1-1740906910.png)