ভারতে 'বাংলাদেশি' তকমায় মৃত্যু; আতঙ্কে অভিবাসী শ্রমিকরা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪২
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তরুণ শ্রমিক জুয়েল রানা গত ২০ ডিসেম্বর ওড়িশার সাম্বলপুরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারান। মাত্র ২০ বছর বয়সী এই যুবককে স্থানীয় একদল মানুষ ঘিরে ধরে প্রশ্ন করে- “কেন একজন বাংলাদেশি এখানে এসেছে?” এরপর লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। তার বোন টুম্পা খাতুন বলেন, “আমাদের দোষ কী? আমরা কি রাজ্যের বাইরে যেতে পারব না?” এই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ওয়ার এ নিয়ে প্রকাশ করেছে বিশেষ প্রতিবেদন।
জুয়েলের বাবা জিয়াউল হক, যিনি কেরালায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন, ছেলের মরদেহ দাফন করতে বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি বলেন, “এখানে মজুরি ২৫০ টাকা, বাইরে ৫০০ টাকা। কাজও সপ্তাহে দুদিনের বেশি মেলে না। আমরা জানি মৃত্যুর ঝুঁকি আছে, তবুও যেতে হয়।” তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে হাজারো পরিবারের বাস্তবতা—অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে অভিবাসন, আর অভিবাসনের পর ‘বাংলাদেশি’ তকমায় নিপীড়ন।
শুধু জুয়েল নয়, সাম্প্রতিক সময়ে মুর্শিদাবাদ ও মালদার বহু শ্রমিক ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, রাজস্থান, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে হামলার শিকার হয়েছেন। অনেককে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ বলে গালাগাল দেওয়া হয়েছে, মারধর করা হয়েছে, এমনকি কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। ওড়িশার গঞ্জাম জেলায় রুহুল ইসলাম নামে এক ফেরিওয়ালাকে “জয় শ্রীরাম” ধ্বনি তুলে আক্রমণ করা হয়। অন্যদিকে মালদার শ্রমিক সুজন সরকারকে প্রকাশ্যে কাপড় খুলে মারধর করা হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে। ওই নির্দেশনায় সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের শনাক্ত ও আটক করার ক্ষমতা দেওয়া হয় রাজ্য পুলিশকে। এর ফলে বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম শ্রমিকদের ওপর নজরদারি ও হয়রানি বেড়ে যায়। অনেককে আটক করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশে কেউ কেউ ফিরে আসতে সক্ষম হলেও আতঙ্ক থেকে যায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিককে আটক বা হয়রানি করা হয়েছে। সংসদে বিষয়টি তুলতে গেলে বিরোধী দলের এমপিদের বক্তব্যও প্রায়ই বাতিল করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য সামিরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তিনি বারবার বিষয়টি উত্থাপন করলেও অনুমতি দেওয়া হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২৩ সালে অভিবাসী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড গঠন করে। ২০২৫ সালে ব্যাপক হয়রানির পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দেন, যারা বাধ্য হয়ে ফিরে আসছেন তাদের এক বছর পর্যন্ত মাসে ৫ হাজার টাকা ভাতা এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বনির্ভর হওয়ার অনুদান দেওয়া হবে। তবে বাস্তবে খুব কম শ্রমিকই এই সুবিধা পাচ্ছেন। স্থানীয় শিল্প যেমন পাটকলের কাজ মাসে ১৪-১৫ হাজার টাকা মজুরি দেয়, যা বাইরে গিয়ে দ্বিগুণ আয় করার সুযোগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে না।
মুর্শিদাবাদে প্রায় ৪৮ শতাংশ পরিবার অভিবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও দারিদ্র্য তাদের বাধ্য করছে বাইরে যেতে। কিন্তু বাইরে গিয়ে তারা ভাষা ও ধর্মের কারণে ‘বাংলাদেশি’ তকমায় আক্রান্ত হচ্ছেন। গত দুই মাসে অন্তত ৩৫ জন শ্রমিক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মারা গেছেন; কেউ দুর্ঘটনায়, কেউ হত্যায়, কেউ আত্মহত্যায়।
বেলডাঙায় আলাউদ্দিন শেখের মৃত্যুতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তার মরদেহ আসার পর স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ ও ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেন। অভিযোগ ওঠে, তাকে বাংলাদেশি সন্দেহে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে বিহারের হাজিপুরে আনিসুর রহমানকে মোবাইল ফোন বিক্রি করতে গিয়ে মারধর করা হয়। তার বাবা জানান, ছেলেকে লোহার রডে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, মৃত্যুর আগে সে বলেছিল তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে আক্রমণ করা হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো এখন জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) হাতে গেছে। কয়েকটি এফআইআর হয়েছে, বহুজন গ্রেপ্তারও হয়েছে। কিন্তু জুয়েল রানার পরিবারের মতো অসংখ্য পরিবার মনে করছে, তদন্তে সমস্যার মূল সমাধান হবে না। তাদের মতে, দারিদ্র্য অভিবাসনে ঠেলে দেয়, অভিবাসন সন্দেহ ডেকে আনে, আর সেই সন্দেহই শেষ পর্যন্ত প্রাণ কেড়ে নেয়।
logo-1-1740906910.png)