মধ্যপ্রাচ্যে এতদিন নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকা দেশগুলো কি এবার নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার ছাতা তৈরি করতে শুরু করেছে?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু তিন দেশের সামরিক সহযোগিতা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিচ্ছে। মক্কায় সই হওয়া চুক্তির মূল কথা তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, এটি অনেকটা ন্যাটোর ‘Article 5’-এর মতো যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির দিকে ইঙ্গিত করছে। এমন এক সময় এই চুক্তি সই হয়েছে, যখন ইরাক ও ইয়েমেন থেকে ইরান সমর্থিত বিদ্রোহীরা সৌদির তেলখনিতে আঘাত করেছে। সৌদিও ছেড়ে কথা বলেনি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো হঠাৎ কেন এই চুক্তি?
এর সবচেয়ে বড় কারণ নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা। ইরানকে ঘিরে চলমান মার্কিন সংঘাত, উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানি ও নৌপথে ঝুঁকি; সব মিলিয়ে সৌদি আরব বুঝতে পারছে, শুধু বিদেশি শক্তির নিরাপত্তা গ্যারান্টির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই রিয়াদ চাইছে নিজের চারপাশে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করতে।
এখানে তিন দেশের শক্তিও পরস্পরের পরিপূরক। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি ও উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প; পাকিস্তানের রয়েছে বড় সেনাবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার; আর সৌদি আরব দিতে পারে বিপুল অর্থ, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ।
তাহলে কি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য শেষ হয়ে যাচ্ছে?
এখনই এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। বরং এটি মার্কিন নির্ভরতা কমানোর একটি প্রচেষ্টা। তুরস্ক নিজেই ন্যাটোর সদস্য, আর সৌদি আরব ও পাকিস্তান দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখে। ফলে নতুন জোটটি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সামরিক জোট নয়; বরং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোরই উদ্যোগ। তুরস্কও স্পষ্ট করেছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং বিদ্যমান জোটের বিকল্পও নয়।
তবে এর কৌশলগত প্রভাব কিন্তু বেশ বড় হতে পারে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মিসরও ভবিষ্যতে এই জোটে যোগ দিতে পারে। অর্থাৎ তিন দেশের উদ্যোগ যদি মিসরসহ আরো দেশকে টানে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হতে পারে।
ইরান-মার্কিন সংঘাতে এর প্রভাব কী?
এটি সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা নয়। বরং সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ইরানি হামলার সম্ভাবনা থাকলে তেহরানকে এখন হিসাব করতে হবে— সৌদিতে আঘাত মানে পাকিস্তান ও তুরস্ককেও সংঘাতে টেনে আনার ঝুঁকি। ফলে এটি deterrence বা প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ভুল হিসাব হলে সংঘাত আরো বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে।
বাংলাদেশের জন্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুল বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন এবং এসব দেশ থেকে আসে বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স। তাই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সামরিক সমীকরণ মানে শুধু ভূরাজনীতি নয়; বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, জ্বালানি মূল্য ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপরও সম্ভাব্য প্রভাব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি হয়তো মার্কিন আধিপত্যের পতনের ঘোষণা নয়। কিন্তু এটি একটি বার্তা অবশ্যই দিচ্ছে: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আর নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। আর সেই পরিবর্তনই ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রবণতা হয়ে উঠতে পারে।
logo-1-1740906910.png)