লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা থেকে জাহাজ রক্ষার জন্য সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। ১৪ দেশের এই জোটের মূল লক্ষ্য বাব আল-মান্দেব প্রণালী, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচল সুরক্ষিত রাখা।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে অনেকেই আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে— এটি কি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে, নাকি নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।
বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বিস্তারিত ঘোষণা না দিলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি লোহিত সাগরে হুতিদের নৌ অবরোধের নিন্দা জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক রুটে নিরবচ্ছিন্ন নৌ চলাচলের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনও সেখানে ব্যক্ত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অবস্থানই বাংলাদেশের জোটে যোগদানের পথ প্রশস্ত করেছে। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরো দৃঢ় করবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় লাভ হতে পারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা বৃদ্ধি। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০-১২ শতাংশ এবং মোট পণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগে অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশীদার করবে।
এছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, পাকিস্তানসহ গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়বে। যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই জোটে যোগদান বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ রাজনীতিতে টেনে নিতে পারে। হুতিদের প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে এসেছে, তারা সৌদি আরবকে ‘সর্বাত্মক প্রতিক্রিয়া’র হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে জোটে থাকা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ সরাসরি সংঘাতের অংশ না হলেও প্রতিরক্ষা জোটে নাম থাকায় কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতও এই জোটকে কীভাবে দেখবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে সামনে রেখে বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণকে অনেকেই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সব সময়ই বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সতর্ক থাকতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জোটে যোগদান বাংলাদেশের জন্য একদিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ, অন্যদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। তাই ঢাকা যদি কেবল প্রতিরক্ষামূলক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার সীমায় অংশগ্রহণ করে, তবে লাভ বেশি হবে। কিন্তু যদি সংঘাতের সরাসরি অংশ হয়ে যায়, তবে ক্ষতির আশঙ্কা প্রবল।
logo-1-1740906910.png)