কোভিড-১৯ মহামারির পর ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার আবারো বড় ধাক্কা খেল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে। অনেক অভিবাসী চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরে প্রবাসী কর্মী প্রেরণ কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো, পর্যটন, সেবা ও বাণিজ্য খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শত শত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের যাত্রা বিলম্বিত হচ্ছে। বিমান ভাড়া বেড়ে গেছে দ্বিগুণেরও বেশি, যেখানে আগে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা ছিল, এখন তা ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার ওপরে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সৌদি আরব সবচেয়ে বড় গন্তব্য। ২০২৫ সালে একাই ৭ লাখ ৫২ হাজার বাংলাদেশি কর্মী গেছেন সৌদি আরবে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার ৭২ জন সৌদি আরবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রবাসী শরিফুল হক জানান, দুবাইয়ে তার রেস্তোরাঁ যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হয়েছে। পর্যটক কমে যাওয়ায় ব্যবসা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আয় কমে যাওয়ায় পরিবারে টাকা পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ATAB) সাধারণ সম্পাদক মজহারুল ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবের রুট এখন প্রায় বন্ধ। কুয়েতের নতুন ভিসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ওমান ও দুবাইয়ের ভ্রমণ ভিসাও দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত। ফলে ভ্রমণ খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প বাজার তৈরি না করায় বড় সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সংঘাতের কারণে চাকরির নিরাপত্তা ও নিয়মিত বেতন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম বলেন, শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা নয়, দক্ষতা ও রেমিট্যান্স আয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। অতিরিক্ত খরচে অভিবাসন অনেক সময় দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং নতুন বাজার খোঁজার ওপর জোর দেন।
চলতি বছর ইতোমধ্যেই ২০১ জন বাংলাদেশি ইরান থেকে এবং ২৮২ জন বাহরাইন থেকে দেশে ফিরেছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
logo-1-1740906910.png)