ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পার হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বোমাবর্ষণ, বিস্ফোরণ আর কঠোর ইন্টারনেট বিধিনিষেধের মধ্যে সাধারণ মানুষ এখন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ শাসকগোষ্ঠীর ওপর হামলায় আনন্দ প্রকাশ করছেন, আবার অনেকেই আতঙ্কে ভুগছেন। বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার চিত্র।
তেহরানের বাসিন্দা হামিদ (ছদ্মনাম) জানান, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর শুনে তিনি পরিবারের সঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে উদযাপন করেছিলেন। পরবর্তী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা তারা ছাদে দাঁড়িয়ে দেখেছেন এবং প্রতিবার আঘাত হানলে উল্লাস করেছেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীর আর কোথাও এমন জায়গা নেই যেখানে বিদেশি হামলায় মানুষ খুশি হয়।”
তবে অন্যদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আলী নামের এক বাসিন্দা বলেন, “এই যুদ্ধের লক্ষ্য ইরানি জনগণের স্বাধীনতা নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ।” ৩০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জানান, তিনি সব সময় আশা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হবে। কিন্তু এখন তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
শাসকগোষ্ঠীর ভীতি এখনো জনমনে বিদ্যমান। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে, সংযোগ অব্যাহত থাকলে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করা হবে। ফলে অনেকেই নাম প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন।
এক নারী বলেন, “যখন শাসকগোষ্ঠীর ওপর আঘাত হয়, তখন আমরা আনন্দ পাই। কিন্তু যখন শিশুরা মারা যায় এবং অবকাঠামো ধ্বংস হয়, তখন আমরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি।”
বিবিসি পার্সিয়ান জানিয়েছে, ইরানের ভেতরে জনমত জরিপ নেই, তবে অধিকাংশ মানুষ শাসনব্যবস্থাকে ঘৃণা করেন। বিরোধীরা দুই ভাগে বিভক্ত— একদল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সমর্থন করছে, অন্যরা আক্রমণকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
সাঈদ নামের এক ব্যক্তি বলেন, “ইরান আক্রমণের কোনো কারণ ছিল না। ইসরায়েলের ইচ্ছাতেই এটি হয়েছে।” অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান যুদ্ধই স্বাধীনতার একমাত্র আশা।
এদিকে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ শিশু রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় মীনাব শহরের একটি বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিশু নিহত হয়েছে।
ইসফাহানের বাসিন্দা সামান (ছদ্মনাম) জানান, তার দুই আত্মীয় বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি আমরা এভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত হয়ে পড়ব।”
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। তেহরানের এক তরুণী প্রথমে খামেনির মৃত্যুর খবরে আনন্দিত হয়েছিলেন, কিন্তু ছয় দিন পর তিনি বলেন, “আমি এখন খুশিও নই, আবার দুঃখিতও নই; আমি কেবল ক্লান্ত।”
ইরানের মানুষ এখন ভীতি, ক্ষোভ, আনন্দ ও হতাশার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ শাসকগোষ্ঠীর পতনকে স্বাধীনতার আশা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বেসামরিক প্রাণহানি ও ধ্বংসে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।
logo-1-1740906910.png)