রমজান ও ঈদ সামনে রেখে আবারো বাড়ছে প্রবাসী আয়। উৎসবের আগে পরিবারকে বাড়তি সহায়তা দিতে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এদিকে, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রযুক্তিনির্ভর মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়ছে এবং দিন দিন এই সেবাটির প্রতি প্রবাসী ও তার প্রিয়জনদের আস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসে প্রায় ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৬ দশমিক ৬ থেকে ২৭ বিলিয়ন ডলারে। আর ২০২৫ সালে রেকর্ড প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধিকে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদকে ঘিরে এ প্রবাহ আরো বাড়তে পারে। এই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স গ্রহণেও স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে শুধু বিকাশ অ্যাকাউন্টে ২০ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ৪১ লাখ বিকাশ অ্যাকাউন্টে এই টাকা গ্রহণ করেছেন প্রবাসীর প্রিয়জনেরা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুততা, সহজলভ্যতা ও নিরাপত্তার কারণে প্রবাসীরা এখন সরাসরি মোবাইল অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠাতে বেশি আগ্রহী।
সৌদি আরবে কর্মরত এক প্রবাসী বাংলাদেশি জানান, আগে ব্যাংকে গিয়ে কাগজপত্র পূরণ করে টাকা পাঠাতে সময় লাগত। এখন বিকাশের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। তিনি বলেন, “ঈদের আগে পরিবারের একাধিক সদস্যের কাছে পাঠানো টাকা পৌঁছেছে কিনা, তা সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত হতে পারি।”
ঢাকার মিরপুরে বসবাসকারী এক গ্রহীতা বলেন, এমএফএস অ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ চলে আসায় ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা নেই। “টাকা এলেই মোবাইলে বার্তা পাই। বাজার, জাকাত বা অন্য খরচ সঙ্গে সঙ্গে মেটানো যায়,” জানান তিনি।
মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকার নির্ধারিত প্রণোদনা ও ডিজিটাল চ্যানেলের বিস্তার- দুটিই বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে। তার মতে, “পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্ত থেকেই বাংলাদেশে টাকা পাঠানো যাচ্ছে। লেনদেন হচ্ছে দ্রুত, কমছে খরচ, নিরাপত্তাও নিশ্চিত হচ্ছে।”
দেশভিত্তিক হিসাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এসব দেশে বড় সংখ্যায় বাংলাদেশিরা কর্মরত অথবা অভিবাসী হিসেবে থাকায় এ প্রবণতা দেখা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটির পরিচালক, প্রযুক্তিবিদ ড. বি এম মইনুল হোসেন মনে করেন, এমএফএসনির্ভর রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের নীরব বিপ্লব তৈরি করেছে। তার ভাষায়, “আমাদের গ্রামের সবাই কিন্তু ট্র্যাডিশনাল ব্যাংকিং সেক্টরে অভ্যস্ত নন, অথচ সবার হাতেই আছে মোবাইল। ফলে এই এমএফএস সেবা মানুষের কাছে এক যুগান্তকারী সেবা। এ সেবার ফলে শক্তিশালী হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, শক্তিশালী হচ্ছে ভোক্তার অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তা। টাকা গ্রহণ ও খরচের স্বাধীনতা সাধারণ মানুষকে করছে স্বাবলম্বী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ চ্যানেলের বিস্তার অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্স শুধু উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবেই কাজ করবে।
logo-1-1740906910.png)