Logo
×

Follow Us

মধ্যপ্রাচ্য

সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘শীতল যুদ্ধ’

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৯

সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ‘শীতল যুদ্ধ’

মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘকাল ধরে অভিন্ন মঞ্চে মিত্র হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক এক জটিল মোড় নিয়েছে। পর্দার আড়ালের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন প্রথমবারের মতো সরাসরি সামরিক উত্তেজনার রূপ নিয়ে প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে সৌদি আরবের বিমান হামলা এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। রিয়াদের অভিযোগ, ওই বন্দরে আমিরাতের পক্ষ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসির জন্য অস্ত্রের একটি বড় চালান পাঠানো হয়েছিল। যদিও আবুধাবি দাবি করেছে, ওই অস্ত্রগুলো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য ছিল, তবে সৌদি আরব এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে।

হাদরামাউত অঞ্চলে আমিরাতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি মনে করছে সৌদি আরব। কারণ ইয়েমেনের এই অঞ্চলের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে রিয়াদ-সমর্থিত শক্তির বাইরে অন্য কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্য সৌদি আরবের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য অগ্রহণযোগ্য। এই বিমান হামলাকে দুই দেশের মধ্যে প্রথম সরাসরি সামরিক মুখোমুখি অবস্থান হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ঘটনার পর আমিরাত ইয়েমেন থেকে তাদের অবশিষ্ট সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও এর মাধ্যমে মূল দ্বন্দ্বের সমাধান হয়নি, বরং দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক ও আদর্শিক পার্থক্যগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব তাদের আঞ্চলিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে রিয়াদ এখন সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তারা এখন জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে সুদান সংকটে তাদের অবস্থানে। সৌদি আরবের লক্ষ্য হলো একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা যা তাদের বিশাল অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক। আবুধাবি রাষ্ট্রবহির্ভূত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় ছোট ছোট শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে এমন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে আমিরাত। যদিও এসব অভিযোগ তারা নিয়মিত অস্বীকার করে আসছে, তবে মাঠপর্যায়ের সমীকরণ ভিন্ন কথা বলছে। সুদানে যেখানে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে, সেখানে আমিরাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী বাহিনীর সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নীতিগত মতপার্থক্য এখন কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং এটি একটি নীরব ‘শীতল যুদ্ধ’-এ রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ এই বিভাজনের প্রমাণ দেয়। তবে এখনই বড় ধরনের কোনো সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কম, কারণ উভয় দেশই জানে যে পূর্ণাঙ্গ সংঘাত কারও জন্যই লাভজনক হবে না। এই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত তারাই জয়ী হবে যারা তাদের প্রভাবকে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে পারবে। বিশেষ করে সুদানের পরিস্থিতি আমিরাতের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে।

Logo