পারস্য উপসাগরের বুকে মুক্তার দ্বীপ হিসেবে পরিচিত বাহরাইন। রমজান মাস এলে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি এক অপূর্ব সাজে সজ্জিত হয়। এখানকার ইফতার টেবিল মানেই কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, বরং হাজার বছরের আরব ঐতিহ্য আর আতিথেয়তার এক অনন্য সংমিশ্রণ। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বাহরাইনিরা তাদের ইফতার আয়োজনে আজও ধরে রেখেছে পূর্বপুরুষদের সেই আদি স্বাদ। আপনি যদি রমজানে বাহরাইনের অলিগলিতে হাঁটেন, তবে বাতাসে ভেসে আসা মশলার ঘ্রাণই আপনাকে বলে দেবে এখানকার খাদ্যাভ্যাসের আভিজাত্যের কথা। বিশেষ করে পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী খাবার ছাড়া বাহরাইনিদের ইফতার যেন অপূর্ণই থেকে যায়।
বাহরাইনি ইফতারের রাজকীয় সূচনা হয় 'মাছবুস' দিয়ে। এটি মূলত বাহরাইনের জাতীয় খাবার হিসেবে স্বীকৃত। অনেকটা বিরিয়ানি বা পোলাওয়ের মতো দেখতে এই খাবারটি মাংস (মুরগি, খাসি বা মাছ) এবং সুগন্ধি চালের এক চমৎকার মেলবন্ধন। এতে ব্যবহৃত বিশেষ বাহরাইনি মশলা ‘বাহারাত’ এবং শুকনো লেবুর (লুমি) টক-মিষ্টি স্বাদ একে সাধারণ রাইস ডিশ থেকে আলাদা করে তোলে। বড় থালায় সাজানো মাছবুস যখন দস্তরখানে রাখা হয়, তখন সেটিই হয়ে ওঠে ইফতারের মূল আকর্ষণ। পরিবারের সবাই মিলে এক পাত্র থেকে এই খাবার খাওয়ার দৃশ্যটি বাহরাইনের সামাজিক বন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
মাছবুসের পরেই যে খাবারটির কথা না বললেই নয়, তা হলো ‘হারিস’। এটি তৈরির প্রক্রিয়া বেশ সময়সাপেক্ষ এবং শ্রমসাধ্য। ভাঙা গম এবং মাংস ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিয়ে মিশিয়ে একটি ঘন মণ্ড তৈরি করা হয়। পরিবেশনের সময় এর ওপরে খাঁটি ঘি আর দারুচিনির গুঁড়ো ছিটিয়ে দেওয়া হয়। হজমে সহায়ক এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর এই হারিস বাহরাইনের প্রাচীন বেদুইন সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। একইভাবে ইফতারে তৃপ্তি জোগাতে পরিবেশিত হয় ‘গাবুজ’ বা বিশেষ মাংসের স্টু। স্থানীয় সবজি আর মাংসের ঝোলে ভেজানো রুটির এই সংমিশ্রণটি সারাদিনের রোজার ক্লান্তি দূর করতে টনিকের মতো কাজ করে।
মিষ্টিমুখ ছাড়া বাহরাইনিদের ইফতারি শেষ হওয়া অসম্ভব। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ হলো ‘লুগাইমাত’। ময়দা, দই আর জাফরান দিয়ে তৈরি ছোট ছোট বলের মতো এই ডাম্পলিংগুলো ডুবো তেলে ভেজে ওপরে খেজুরের সিরা বা মধু ঢেলে দেওয়া হয়। বাইরে মচমচে আর ভেতরে নরম এই লুগাইমাত ছোট-বড় সবার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সবশেষে আসে ঐতিহ্যের চূড়ান্ত ছোঁয়া ‘মুহাম্মার’। এটি মূলত মিষ্টি ভাতের একটি পদ, যা সাধারণত ভাজা মাছের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। খেজুরের রস বা গুড় দিয়ে রান্না করা এই লালচে চালের ভাতটি স্বাদে বেশ বৈচিত্র্যময়।
বাহরাইনের এই ইফতার আয়োজন কেবল খাবারের তালিকা নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতির একটি অংশ। প্রতিটি গ্রাসে পাওয়া যায় আরবীয় ঐতিহ্যের ঘ্রাণ আর আতিথেয়তার উষ্ণতা।
logo-1-1740906910.png)