এমসি এক্সপ্লেইনার
নিষেধাজ্ঞা তুললে পরমাণু চুক্তির ইঙ্গিত ইরানের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:৩১
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে দেশটির পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব- এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তেহরানের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে এই বক্তব্যকে অনেকেই সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতির আভাস হিসেবে দেখছেন। তবে বাস্তবতা বলছে, পথ এখনো দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত।
কেন এই সম্ভাবনাকে ‘আপাত সমঝোতা’ বলা হচ্ছে? কারণ দুই দেশের অবস্থান এখনো স্পষ্টভাবে দূরত্বে দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উপলব্ধি করেছে, কেবল চাপ ও হুমকির কৌশলে ইরানকে নত করা সম্ভব নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যেই বলেছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারপরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতার পথ খোলা রাখতে চায়।
সম্প্রতি ওমানের মধ্যস্থতায় যে আলোচনা হয়েছে, তা ছিল অস্বাভাবিক কূটনৈতিক বিন্যাসে। দুই দেশের প্রতিনিধিরা একই টেবিলে বসেননি। বরং পৃথক কক্ষে অবস্থান করে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব আদান-প্রদান হয়েছে। কূটনৈতিক মহলে এটিকে ‘শাটল ডিপ্লোম্যাসি’ বলা হলেও আলোচনার এই কাঠামো থেকেই দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাসের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ওয়াশিংটনের দাবি, আলোচনায় অগ্রগতি থমকে আছে ইরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণে। তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ রাভাঞ্চি ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিক হলে তেহরানও সমঝোতার পথে এগোতে প্রস্তুত। তার ভাষায়, “বল এখন আমেরিকার কোর্টে।” তিনি অভিযোগ করেন, চুক্তি না হওয়ার জন্য ইরান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।
তবে সমীকরণ এত সহজ নয়। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আলোচনা কেবল পরমাণু কর্মসূচি নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন আলোচনার টেবিলে আনা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এই সীমারেখাই ভবিষ্যৎ আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অন্যদিকে, চুক্তি না হলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ইসরায়েলের কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। ফলে কূটনীতি ও সামরিক চাপ দুই পথই খোলা রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য ও আঞ্চলিক স্বার্থে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ওয়াশিংটন চায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা, আর তেহরান চায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অর্থনৈতিক স্বস্তি। এই পারস্পরিক সন্দেহ ও স্বার্থসংঘাত দ্রুত সমাধানের পথে বড় প্রতিবন্ধক।
তবু পুরোপুরি হতাশ হওয়ার কারণও দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ইরান জানিয়েছে, চুক্তির আশাতেই তারা আগামী সপ্তাহে জেনেভায় অনুষ্ঠেয় পরবর্তী দফা আলোচনায় অংশ নেবে। প্রশ্ন এখন একটাই- দুই পক্ষ কি রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখিয়ে সমঝোতার মাঝপথে মিলিত হতে পারবে, নাকি উত্তেজনা আরো বাড়বে?
এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও এটুকু স্পষ্ট, ইরান-মার্কিন সম্পর্কে একদিকে যেমন চাপ ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে তেমনি কূটনৈতিক দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গন এখন তাকিয়ে আছে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
logo-1-1740906910.png)