ট্রাম্পের 'বোর্ড অব পিস': জাতিসংঘ কি কোণঠাসা?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৮
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ হিসেবে ‘বোর্ড অব পিস’ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। তার দাবি, এই বোর্ড দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তপাত বন্ধ করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
দৈনিক সমকাল প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন বলছে, আন্তর্জাতিক মহলে এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগের কথা। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে জাতিসংঘের বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা। ফাঁস হওয়া খসড়া সনদ অনুযায়ী, ট্রাম্প আজীবনের জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন এবং নতুন সদস্য আহ্বান, সংস্থা গঠন বা বাতিলের ক্ষমতা তার হাতে থাকবে। স্থায়ী সদস্য হতে চাইলে কোনো দেশকে দিতে হবে ১০০ কোটি ডলার।
ইউরোপে এ নিয়ে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেছেন, “আমাদের নিয়ে কেউ যেন খেলা না করে।” অন্যদিকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, “ট্রাম্প মানেই শান্তি।” যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার শান্তি উদ্যোগে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সুইডেন ও নরওয়ে আপাতত এতে যোগ না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া বোর্ডে যুক্ত হতে আগ্রহী। তবে মস্কো জানিয়েছে, তারা এখনো মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছে। কয়েকটি মুসলিম দেশ গাজায় স্থায়ী শান্তির শর্তে সীমিতভাবে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখালেও খসড়া সনদে গাজার নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।
জাতিসংঘকে নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেছেন, বোর্ড সম্পূর্ণ হলে জাতিসংঘের সঙ্গে মিলেও যা চাই তা করা যাবে। আবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “জাতিসংঘ চাইলে প্রতিস্থাপিতও হতে পারে, ওরা খুব একটা কার্যকর হয়নি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের অচলাবস্থা ও ভেটো রাজনীতির কারণে জাতিসংঘের শান্তি প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা আগেই প্রশ্নবিদ্ধ। সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা মার্টিন গ্রিফিথস মনে করেন, ট্রাম্পের উদ্যোগ জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রতিফলন হলেও এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি রয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তার ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে, যদি তিনি যোগ না দেন। স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, এটি “বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছে।”
ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি আটটি যুদ্ধের ইতি টেনেছেন। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, সেগুলো আসলে যুদ্ধবিরতি, যার কিছু ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা কার্যকর হয়েছিল। গাজায়ও তার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত হয়।
তবে বোর্ডের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে গাজা সংঘাতের সমাধান। নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে অঙ্গীকার করেছেন, আরব নেতারা মনে করেন, টেকসই শান্তির একমাত্র পথ হলো ফিলিস্তিনিদের স্বশাসন ও ইসরায়েলি দখলদারির অবসান। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কারণ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি মস্কো ও মিনস্কের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অনীহা প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের সাবেক উপ-মহাসচিব মার্ক মালক ব্রাউন মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের উদ্যোগ হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে জাতিসংঘ সংস্কারের দাবিকে আবার আন্তর্জাতিক এজেন্ডার শীর্ষে নিয়ে আসবে। তার মতে, দুর্বল জাতিসংঘ নেতৃত্বের সময়ে এটি কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান হতে পারে।
বস্তুত ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। কেউ এটিকে শান্তির নতুন কাঠামো হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি জাতিসংঘকে কোণঠাসা করার কৌশল। বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে, এই বোর্ড আসলেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর হবে নাকি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে।
logo-1-1740906910.png)