দুবাইয়ের ঝলমলে নগরীতে গড়ে উঠেছে এক ‘ছোট্ট বাংলাদেশ’
সাইফুল ইসলাম তালুকদার, সংযুক্ত আরব আমিরাত
প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫, ১১:৫৬
দুবাই মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র নাইফ রোড যেন ঢাকার এলিফ্যান্ট রোড বা গুলিস্তানের এক রঙিন প্রতিচ্ছবি। দিন-রাত এখানে ভিড় জমে থাকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের; ব্যবসা, কর্মসংস্থান আর স্বপ্নে মুখর এক বাংলাদেশি পাড়া যেন।
দুবাই ঘুরতে গেলে উঁচু অট্টালিকা, বিলাসবহুল মল আর ঝলমলে শপিং সেন্টারের পাশাপাশি স্থানীয়রা আপনাকে বলবেন, “কম দামে ভালো জিনিস কিনতে চাইলে একবার নাইফ রোডে যান।” এখানে মিলবে-সাশ্রয়ী মূল্যের স্বর্ণ (গোল্ড), মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, কসমেটিকস, রেডিমেড গার্মেন্টস, পারফিউম, চকলেট, ফুড আইটেম সবই তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। ফলে এই এলাকাকে স্থানীয়রা বলেন “সাশ্রয়ের বাজার”। কিন্তু শুধু কেনাকাটার স্থান নয়, নাইফ রোড এখন হয়ে উঠেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। প্রবাসীদের ‘বাঙালি পাড়া’ নাইফ রোডের আশপাশের ফিরোজ আল মুরার, মুর্শিদ বাজার, গোল্ড সূক, আল মানার সেন্টার, সাবকা স্টেশন, গারগাছ সেন্টার, বানিয়াস স্কয়ার, আল নাখিল সেন্টার; সর্বত্র এখন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সক্রিয় উপস্থিতি। প্রবাসী উদ্যোক্তারা ছোট থেকে বড়-সব ধরনের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
এখানে আছে গ্রোসারি শপ, মোবাইল ও কসমেটিকস দোকান, গার্মেন্টস ও পারফিউম শপ, রেস্টুরেন্ট ও সুপারমার্কেট এমনকি স্বর্ণের দোকানও। প্রতিদিন এখান থেকে কোটি কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠানো হয় বাংলাদেশে। নাইফ রোড যেন প্রবাসী অর্থনীতির এক অদৃশ্য রক্তধমনী।
নাইফ রোডের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, “আগে বাংলাদেশি কর্মচারী রাখতে পারতাম, কিন্তু এখন ভিসা বন্ধ থাকায় ভারত ও পাকিস্তানের লোক রাখতে হচ্ছে। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করত, তাহলে আমরা আরো ভালোভাবে ব্যবসা চালাতে পারতাম।”
তারা আরো বলেন, “আগের মতো ব্যবসা এখন তেমন জমছে না। বাংলাদেশি ভিসা না থাকায় লোকবল পাওয়া কঠিন। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি ব্যবসা চালিয়ে যেতে। কারণ এখান থেকেই আমরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখি।”
দুবাইয়ের দেরা বাজারের এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।অনেকে ইতোমধ্যেই সিআইপি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন, যা প্রবাসী সমাজের জন্য এক বিশাল গর্বের বিষয়।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলেন, “আমরা হয়তো বড় ব্যবসায়ী নই, কিন্তু দেশের প্রতি আমাদের টান অনেক। প্রতিদিন পরিশ্রম করে যা আয় করি, তার বড় অংশ পরিবার ও দেশের জন্য পাঠাই।”
চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা
প্রবাসী ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকার যদি প্রবাসীদের সমস্যাগুলোর প্রতি আরো গুরুত্ব দেয়, বিশেষ করে ভিসা ও শ্রমবাজার বিষয়ক জটিলতা দূর করতে আমিরাত সরকারের সঙ্গে আলোচনায় এগিয়ে আসে, তাহলে এখান থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। “আমরা দেশের জন্য কাজ করতে চাই। সরকার যদি পাশে দাঁড়ায়, আমরাও আরো শক্তভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারব,” এমন প্রত্যাশা প্রবাসীদের।
দুবাইয়ের নাইফ রোডে হাঁটলে মনে হয় আপনি যেন বাংলাদেশের কোনো প্রাণবন্ত বাজারে আছেন। চা-সিগারেটের দোকানে আড্ডা, বাংলা গানের সুর, দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা “মা-বাবার দোয়া ট্রেডিং” বা “বাংলা ভাই স্টোর” সবকিছুতেই মিশে আছে মাতৃভূমির ভালোবাসা। এই প্রবাসী বাংলাদেশিরাই আসলে দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
তাদের পরিশ্রম, স্বপ্ন আর ভালোবাসায় প্রবাসেও বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে গর্বের সঙ্গে।
logo-1-1740906910.png)
