মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আশার আলো
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১৯:১২
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় দেশটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ উভয় জায়গায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অভিবাসন ও শিক্ষা নীতিতে আরো জোরালো বিরোধিতার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য পিআইই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ সীমিত করা এবং স্নাতক শেষের পর কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত করার উদ্যোগের মধ্যে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের এই জয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান নীতিগুলো পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উচ্চশিক্ষা ও অভিবাসনবিষয়ক সংগঠন প্রেসিডেন্টস অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী মিরিয়াম ফেল্ডব্লাম বলেন, নির্বাচনের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, ভোটাররা ন্যায্যতা ও বাস্তবসম্মত নীতির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। নতুন কংগ্রেসের সামনে ভিসা পেতে বিলম্ব, আবেদন প্রত্যাখ্যান, ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিবাসন কার্যক্রমের প্রভাব এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হওয়ার বিষয়গুলো পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে নতুন আইন পাসের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে। একই সাথে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন এমন প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন আটকে দেয়া বা বিলম্বিত করার ক্ষমতাও পাবে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে হোয়াইট হাউসকে আলোচনায় বসতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগের বড় একটি বিষয় হচ্ছে ঐচ্ছিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বা অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (ওপিটি)। এ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে নির্দিষ্ট সময় দেশটিতে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান।
গত ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) একটি প্রস্তাবিত বিধিমালা প্রকাশ করে। এতে কোনো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে ওপিটিতে সুপারিশ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ৭০ হাজার ডলার ফি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীর প্রাথমিক ওপিটি মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতি বছর আরো ৩০ হাজার ডলার ফি আরোপের কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি ও শিক্ষা কার্যক্রমেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া শিক্ষাকালীন ইন্টার্নশিপ ও কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের সুযোগ দেয়া কারিকুলার প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (সিপিটি) নিয়েও বিধিনিষেধ বাড়িয়েছে মার্কিন প্রশাসন। গত আগস্টে ডিএইচএস জানায়, কোনো ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যতামূলক অংশ হলেই কেবল শিক্ষার্থীদের এ প্রশিক্ষণের অনুমতি দেয়া উচিত। এর ফলে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ইন্টার্নশিপ বাতিল হয়েছে বলে নীতিটির বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলো জানিয়েছে। হার্ভার্ড, ইয়েল, প্রিন্সটন ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তাদের নিয়ম পর্যালোচনা বা কঠোর করেছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী দ্য পিআইই নিউজকে বলেন, ডেমোক্র্যাটদের জয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা নীতিগুলোর অনেকগুলোই আইন নয়, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এসেছে। তাই কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও রাতারাতি এসব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে যে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না। যারা ইতিমধ্যে দেশ ছেড়েছেন, শুধু নির্বাচনের ফলাফলের কারণে তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনাও কম।
এদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও শিক্ষার্থী বিনিময় কার্যক্রমের পক্ষে কাজ করা সংগঠন ন্যাফসার প্রধান নির্বাহী ফান্তা আও বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, আন্তর্জাতিক শিক্ষার গুরুত্ব ও মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয় না। নতুন কংগ্রেসের মাধ্যমে গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতে নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও তাৎক্ষণিকভাবে ভিসা, কর্মসংস্থান কিংবা অভিবাসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কারণ, কংগ্রেসের আইন প্রণয়নের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমেও অনেক অভিবাসন নীতি কার্যকর করা সম্ভব।
তাই যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আগামী দিনে কংগ্রেস ও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ, ইন্টার্নশিপ এবং ভিসার নিয়মে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের ফলাফল নীতিগত পরিবর্তনের চেয়ে আপাতত মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি বেশি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ও কর্মবাজার এখনো আকর্ষণীয়, তবে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অভিবাসননীতি।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা হলো শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেখে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। ভিসার অনিশ্চয়তা, পড়াশোনা-পরবর্তী চাকরি, স্পনসরশিপ এবং শিক্ষার বিপরীতে সম্ভাব্য আর্থিক লাভ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকায় নির্বাচনের ফল আশাব্যঞ্জক মনে হলেও কিন্তু ভিসা-সংকটের আপাত অবসান হবে না।
logo-1-1740906910.png)