জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:৫৩
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘরবাড়ি হারানো মানুষের সামনে নতুন সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। খরা, বন্যা, তীব্র দাবদাহ ও পানির সংকটের মতো বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন। জলবায়ু পরিস্থিতির অবনতি হলে তাদের জীবনযাত্রা আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি শুক্রবার (৬ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ইউএনএইচসিআর। এতে সংঘাত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়াবহ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বসবাস করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এসব জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে জরুরি ভিত্তিতে অর্থায়ন প্রয়োজন।
সংস্থাটির সহকারী হাইকমিশনার (কার্যক্রম) আন্তন লেইস গার্সিয়া বলেন, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির শিকার এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তাদের কাছে জলবায়ু তহবিল পৌঁছানো জরুরি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমন দেশে ফিরেছেন, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার পরিস্থিতি তুলে ধরেছে সংস্থাটি। দেশটিতে সম্প্রতি প্রায় ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু সেখানে পানির সংকট বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গত মে মাসে ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যায় বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আফ্রিকার শরণার্থীশিবিরগুলোতেও তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়ছে। ইউএনএইচসিআরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রতি তিনটি শরণার্থীশিবিরের একটিতে বছরে অন্তত ১০০ দিন বিপজ্জনক তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। ইথিওপিয়ার হেলাওয়েইনসহ কয়েকটি শিবিরে বছরে ২০০ দিনের বেশি সময় তীব্র গরম থাকতে পারে। এতে হিটস্ট্রোক ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়বে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, শরণার্থীদের অনেকেরই শীতল পরিবেশ, নিরাপদ পানির উৎস এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে প্রচণ্ড গরম থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হলে শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া দেশগুলোর ওপর জলবায়ুর চাপ আরো বাড়তে পারে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন বলে সতর্ক করেছে ইউএনএইচসিআর।
এ পরিস্থিতিতে কপ৩১ সম্মেলনে অংশ নেয়া সরকার ও জলবায়ু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অভিযোজন কার্যক্রমে অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বরাদ্দ অর্থের মাত্র ১০ শতাংশের মতো পৌঁছায় সংঘাত ও সংকটে থাকা দেশগুলোতে।
এর আগে গত বুধবার জাতিসংঘের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে ৩০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন। তবে ধনী দেশগুলো এ অর্থ জোগানের প্রতিশ্রুতি পূরণে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
logo-1-1740906910.png)