Logo
×

Follow Us

ইউরোপ

ইউরোপ সংকটের মূল কোথায়?

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৫

ইউরোপ সংকটের মূল কোথায়?

ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও জনঅসন্তোষকে ঘিরে অভিবাসন প্রশ্নটি আলোচনায় থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের মূল কারণ আরো গভীরে। আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি সেবার অবনতিই এখন ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন দেখা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু অর্থনৈতিক চাপ। কোথাও শিক্ষার্থীরা শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে প্রতিবাদ করছে, কোথাও তরুণেরা বাড়িভাড়ার ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে। আবার অনেক দেশে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।

পরিসংখ্যানও সেই বাস্তবতাকে তুলে ধরছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাড়ির দাম বেড়েছে ৫৩ শতাংশ এবং ভাড়া বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ফলে আবাসন সমস্যা এখন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্য ও অ্যালকোহলবিহীন পানীয়ের দাম প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, তবে এতে মানুষের ব্যয়ভার কমেনি। কারণ একবার বেড়ে যাওয়া পণ্যের দাম সাধারণত আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এখনো চাপে রয়েছে।

পর্তুগাল বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভাড়ার হারও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আবাসনের ঘাটতি ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। একই ধরনের পরিস্থিতি স্পেনসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে তরুণ প্রজন্ম। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও স্থায়ী চাকরি, পর্যাপ্ত আয় এবং সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ইউরোপের রাজনীতিতে অভিবাসন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়প্রার্থীদের পুনর্বাসন এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলোর অধিকাংশের মূল দাবি শিক্ষা, আবাসন, মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি সংকটের জন্য অভিবাসীদের দায়ী করা বাস্তব পরিস্থিতির সরলীকরণ বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো যখন অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন অতি ডানপন্থি দলগুলো অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এতে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধিও ইউরোপের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভূরাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরো প্রকট করেছে মাত্র; আবাসন সংকট, বৈষম্য বা শিক্ষা খাতের সমস্যার মূল কারণ এগুলো নয়।

বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতে ইউরোপীয় রাজনীতিতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে: অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও কল্যাণনীতি, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ঐক্য। তবে সামগ্রিকভাবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইউরোপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অভিবাসন নয়; বরং নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা, নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

Logo