উত্তর আফ্রিকার সংকটপীড়িত দেশ লিবিয়াকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপগামী অনিয়মিত বা অবৈধ অভিবাসনের প্রধান ট্রানজিট রুট বা ‘করিডোর’ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে (Truth Social) দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প লিবিয়ার জনগণের স্থিতিশীলতা এবং ইসলামিক স্টেটের (আইসিস) বিরুদ্ধে মার্কিন যৌথ অভিযানের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেন, তবে একই সাথে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে লিবিয়ার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে চলমান এই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন স্রোত অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, "লিবিয়ার জনগণ আত্মমর্যাদাশীল, অতিথিপরায়ণ এবং তাদের দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রাপ্য। আইসিসের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয়ের ধারাবাহিকতায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও লিবিয়ার মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব বিদ্যমান। আমরা তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান করি, তবে লিবিয়া কোনোভাবেই অবৈধ অভিবাসনের একটি করিডোর হিসেবে টিকে থাকতে পারে না।"
ট্রাম্প আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার সার্বভৌমত্ম প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অবাধ নির্বাচন আয়োজন এবং বিদেশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে দেশটিকে একীভূত করার প্রক্রিয়ায় সমর্থন জানিয়ে যাবে।
ট্রুথ সোশ্যালের এই কূটনৈতিক বার্তার কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের পেরি (Perry) শহরে আয়োজিত আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্পের একটি ভাষণ নতুন আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। সেখানে ডেমোক্রেটিক সিনেটর জন ওসফ (Jon Ossoff)-এর তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন যে, ওসফ এমন একটি বিলে সমর্থন দিয়েছেন যা লিবিয়া, ইয়েমেন, হাইতি ও সোমালিয়ার মতো "সন্ত্রাসপীড়িত" দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পথ সহজ করবে। ভাষণে ট্রাম্প নিজের প্রথম মেয়াদের বিতর্কিত মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে এই দেশগুলোকে আবারো আপত্তিকর ভাষায় সম্বোধন করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সোমালি অভিবাসীদের সম্পর্কে অবমাননাকর ও মিথ্যা দাবি উত্থাপন করেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে লিবিয়া সরকার। ত্রিপোলিতে অবস্থানরত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত 'জাতীয় ঐকমত্যের সরকার' (GNU) এবং দেশের পূর্বপ্রঞ্চলের প্রশাসন যৌথভাবে এই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ লিপি জমা দিয়েছে এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী রাজনীতিতে লিবিয়ার নাম টেনে আনা ও লিবীয় নাগরিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ফ্রন্টেক্স (Frontex) প্রকাশিত রিপোর্টে উঠে এসেছে যে ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে ইউরোপে অনুপ্রবেশকারী অবৈধ অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে লিবিয়ার উপকূল। সেখানে বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার অনিয়মিত অভিবাসী লিবিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী উত্তাপের মধ্যে লিবিয়ার মানবিক ও সীমান্ত সংকট এখন নতুন মাত্রা লাভ করেছে।
logo-1-1740906910.png)