চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাহ্যিক সীমান্ত দিয়ে অবৈধ বা অনিয়মিত অনুপ্রবেশের সার্বিক সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেলেও ভূমধ্যসাগরীয় বিপজ্জনক সমুদ্রপথ অতিক্রমকারীদের জাতীয়তার শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশিরা। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূল রক্ষাকারী সংস্থা 'ফ্রন্টেক্স' (Frontex)-এর সদ্য প্রকাশিত অক্টোবর প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ফ্রন্টেক্সের তথ্য মতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইইউ সীমান্তে ৯১ হাজারের বেশি অনিয়মিত প্রবেশের তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ কম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনিয়মিত প্রবেশের প্রায় ৬০ শতাংশই ঘটেছে পূর্বাঞ্চলীয় (Eastern) ও কেন্দ্রীয় (Central) ভূমধ্যসাগরীয় রুটে। এর মধ্যে লিবিয়া থেকে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ, এজিয়ান সাগর ও তুরস্ক সীমান্ত সংলগ্ন 'পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে' অনিয়মিত প্রবেশ ঘটেছে প্রায় ৩১ হাজার ৮০০টি, যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের অন্যতম শীর্ষ জাতীয়তা হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন সুদান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের নাগরিকেরা। অন্যদিকে লিবিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে ইতালিগামী 'কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় রুটে' ২২ হাজার ৫০০টি অবৈধ প্রবেশের তথ্য মিললেও সেখানেও আলজেরিয়া ও সোমালিয়া দেশের নাগরিকদের পাশাপাশি অন্যতম প্রধান গ্রুপ ছিল বাংলাদেশি প্রবাসীরা।
সীমান্তে কড়াকড়ি ও মোট অনুপ্রবেশের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। ফ্রন্টেক্স আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ২ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রগুলো এখনো অভিবাসীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে উপচে পড়া ও চলাচলের অনুপযোগী কাঠের নৌকা বা ডিঙ্গিতে সমুদ্র পারাপারের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফ্রন্টেক্সের নির্বাহী পরিচালক হ্যানস লিটেনস সতর্ক করে জানান, সংখ্যা কমলেও পাচারকারী নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় হয় না; তারা সুযোগের অপেক্ষায় রুট পরিবর্তন করে। এদিকে অনিয়মিত অভিবাসন রোধে গত ১২ জুন ২০২৬ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন 'প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম' আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই আইনের অধীনে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের কঠোর বায়োমেট্রিক, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। যাদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ভিত্তি নেই বা আইনি অধিকার নেই, তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ফ্রন্টেক্স সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করছে। বিশেষ চ্যাটার্ড ফ্লাইটে ইউরোপের ৩ দেশ থেকে ৩৫ বাংলাদেশির প্রত্যাবাসন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস' (SOP) বা সমঝোতার অংশ হিসেবে ইতালি, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা ৩৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফ্রন্টেক্সের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি বিশেষ জয়েন্ট চার্টার্ড ফ্লাইটে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। তাদের মধ্যে ইতালি থেকে ১৯ জন, গ্রিস থেকে ১০ জন এবং সাইপ্রাস থেকে ৬ জন রয়েছেন। ঢাকাস্থ ইতালি দূতাবাস ও বিমানবন্দর সূত্র নিশ্চিত করেছে, অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে ইইউ 'জিরো টলারেন্স' অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং অবৈধ প্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সেনজেন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে।
logo-1-1740906910.png)