মালয়েশিয়ার লজিস্টিকস, কৃষি ও মোটরযান প্রস্তুতকারক শিল্পে কাজের খোঁজে আসা দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী শ্রমিকরা এক ভয়াবহ ও আন্তর্জাতিক অর্থভিত্তিক পাচারচক্রের জালে আটকে পড়েছেন। জাল পাসপোর্ট, শারীরিক নির্যাতন, পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত এবং মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে কেনাবেচার এক ভয়াবহ দাসত্বের চিত্র সামনে এসেছে। সম্প্রতি কুয়ালালামপুর থেকে প্রকাশিত সংবাদসংস্থা মালয়েশিয়া নাউ এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিভাবে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারের অসহায় শ্রমিকদের চাকরির লোভ দেখিয়ে প্রতারণা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশের মোজাফফরনগর থেকে আসা রামজান, দানিশ ও বাববার নামের তিন তরুণের করুণ কাহিনী প্রকাশ পেয়েছে। তাদের প্রতি মাসে দুই হাজার ১২৭ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় রুপি) বেতনে বাদাম প্যাকিংয়ের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে কুয়ালালামপুরে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেখানে পৌঁছানোর পরেই তাদের মূল পাসপোর্ট ইশা নামের এক আন্তর্জাতিক পাচারকারী কেড়ে নেয়। কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের দিয়ে প্রতিদিন ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ৩০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের ভারী বাক্স বহনের কাজ করানো হতো।
অভিযোগ উঠেছে, বেতন দাবি করলে বা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানালে এই শ্রমিকদের বিনাবেতনে অন্যান্য বড় বড় কোম্পানিতে 'বিক্রি' করে দেওয়া হতো। গত সেপ্টেম্বর মাসে কোনোমতে দেশে ফিরে যেতে সক্ষম হওয়া ৩৭ বছর বয়সী ভারতীয় নাগরিক বাববার জানান, গত পাঁচ মাসে তাকে তিনটি বড় কোম্পানির কাছে কেনাবেচা করা হয়েছে। এমনকি ভারতীয়দের কাজের আইনি নিষেধাজ্ঞা ঢাকতে তার হাতে নেপালি জাল পাসপোর্ট তুলে দেওয়া হয়। একই ধরনের জাল পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছিল অন্য শ্রমিকদেরও।
উদ্ধার তৎপরতা বা আইনি পদক্ষেপ নস্যাৎ করতে পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিম উপায়ে শ্রমিকদের 'সম্মতি' রেকর্ড করত। পাচারকারীরা শ্রমিকদের প্রচণ্ড মারধর ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক ভিডিও বানিয়ে নিত, যেখানে শ্রমিকদের বলতে হতো যে তারা কর্মক্ষেত্রে নিরাপদে ও ভালো অবস্থায় আছেন। ভারতের 'জাতীয় বন্ধকী শ্রমিক নির্মূল কমিটির' আহ্বায়ক নির্মল গোরানা জানান, এই ধরনের ভুয়া ও স্ক্রিপ্টেড ভিডিওর কারণে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় বিভ্রান্ত হয় এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীরা আইনি সহায়তা পান না।
ঘটনায় জড়ানো কোম্পানিগুলোর সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের একটি প্রতিষ্ঠান সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে যে, তাদের কাছে কোনো অবৈধ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের রেকর্ড নেই। সরকারি দপ্তর ও ভারতীয় হাই কমিশনের তদন্তে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করেছে এবং তাদের সমস্ত নথিপত্র বৈধ রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ার প্রধান প্রধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে কাগজপত্রহীন এই শ্রমিকদের অত্যন্ত কম খরচে ও বেআইনিভাবে খাটুনি আদায়ে ব্যবহার করে আসছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতি অনুযায়ী অনুস্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ ও ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মালয়েশিয়ার বর্তমান 'স্পন্সরশিপ' ব্যবস্থার কারণে একজন শ্রমিকের আইনি বৈধতা সম্পূর্ণভাবে মালিকের ওপর নির্ভর করে। ফলে মালিকপক্ষের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই একজন বৈধ শ্রমিক রাতারাতি 'অবৈধ বা কাগজপত্রহীন' অভিবাসীতে পরিণত হন। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের হাজার হাজার শ্রমিকের প্রলোভনে পড়ে কোটি টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল।
ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 'মাদাদ' (MADAD) পোর্টালে আকুতি জানানো হলেও প্রশাসনিক জটিলতায় আশানুরূপ সাহায্য মেলেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে ভারতের মিরাট ও মোজাফফরনগর থানায় অভিযুক্ত পাচারকারী ইশা এবং তার সহযোগী নদীম, তালিব, তৈয়ব ও দিলশাদের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর (FIR) দায়ের করা হলেও তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।
শ্রম অধিকার কর্মী নির্মল গোরানা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাদের সংস্থা মালয়েশিয়ায় পাচারের শিকার হয়ে চরম বন্দিদশায় দিন কাটানো ২০ জনেরও বেশি ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। ভুক্তভোগীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অবৈধ শ্রম খাটিয়ে মুনাফা লোটা মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মূল কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য জোর দাবি উঠেছে।
logo-1-1740906910.png)