Logo
×

Follow Us

আফ্রিকা

ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধে ঘরছাড়া লাখো মানুষ, সীমান্তে অভিবাসীদের ঢল

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:১৭

ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধে ঘরছাড়া লাখো মানুষ, সীমান্তে অভিবাসীদের ঢল

আফ্রিকার জিবুতি উপকূলে নৌ দুর্ঘটনায় শিশুসহ ১৩৯ জনেরও বেশি ইথিওপিয়ান অভিবাসীর মর্মান্তিক সলিল সমাধির রেশ কাটতে না কাটতেই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের এক আশঙ্কাজনক ও দ্বিমুখী মানবসংকটের তথ্য প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। চরম অস্থিতিশীল এই দেশটি বর্তমানে একই সাথে দুইমুখী মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। 

একদিকে দেশটির পশ্চিম উপকূলে নতুন করে তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় এ পর্যন্ত দুই লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি স্থানীয় বাসিন্দা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত থাকা সত্ত্বেও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে আসা হাজার হাজার নতুন অভিবাসীর আগমন অব্যাহত রয়েছে।

আইওএমের সংগৃহীত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মোট এক লাখ ৩৪ হাজার ১০০ জন নতুন অভিবাসী ইয়েমেনে প্রবেশ করেছেন। এই সংখ্যাটি ২০২৫ সালের পুরো বছরে ইয়েমেনে আসা মোট এক লাখ ১০ হাজার ১৪৪ জন অভিবাসীর তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। এমনকি ২০২৪ সালে রেকর্ড হওয়া ৬০ হাজার ৮৯৭ জন অভিবাসীর তুলনায় এই আগমন অর্ধেকেরও বেশি বা দ্বিগুণের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে। চরম যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও অভিবাসীদের এই রেকর্ড ঢল আন্তর্জাতিক সংস্থাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

তাইজসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তুচ্যুতির ছড়াছড়ি আইওএম প্রকাশিত ‘ডিসপ্লেসমেন্ট ট্র্যাকিং ম্যাট্রিক্স’ (ডিটিএম)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ইয়েমেনে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা পৌঁছেছে দুই লাখ ১৭ হাজার ৩০৩ জনে, যা প্রায় ৩৬ হাজার ২১৬টি পরিবারের সমান। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ বাস্তুচ্যুত মানুষ অবস্থান করছেন সংঘাতকবলিত তাইজ প্রদেশে। তবে চলমান তীব্র লড়াইয়ের কারণে তাইজের অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরাসরি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় লাহাজ প্রদেশে ৪৫ হাজার ৩৯০ জন এবং এডেন অঞ্চলে ২৬ হাজার ১১২ জন গৃহহীন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাইজ প্রদেশের জাবাল হাবাশি, আল মা’আফের এবং আশ শামায়াতায়ন অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় গত কয়েক দিনে সরাসরি সামরিক হামলা ও সংঘর্ষের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্থানীয় পরিবারগুলো প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

যুদ্ধ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা যখন জীবন বাঁচাতে ইয়েমেন ছাড়ার তাগিদ অনুভব করছেন, ঠিক তখনই কাজের খোঁজে বিপরীত পথ ধরে ইয়েমেনে প্রবেশ করছেন আফ্রিকান অভিবাসীরা। কেবল গত সেপ্টেম্বর মাসেই ১১ হাজার ৮৪১ জন অভিবাসী নতুন করে ইয়েমেনে পা রেখেছেন। এদের মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি অভিবাসী সরাসরি যুদ্ধকবলিত তাইজ এলাকা দিয়ে অতিক্রম করেছেন। এছাড়া আবিয়ান এবং শাবওয়াহ সীমান্ত অঞ্চল দিয়েও বিদেশি নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইওএমের মহাপরিচালক এমি পোপ এক বিবৃতিতে বর্তমান পরিস্থিতিকে চরম হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, একই ভূখণ্ডে সম্পূর্ণ দুটি ভিন্নমুখী মানুষের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে—ইয়েমেনি পরিবারগুলো বেঁচে থাকার আশায় পালাচ্ছে, অন্যদিকে আফ্রিকান তরুণরা একটু উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ইয়েমেনের চরম বিপদসঙ্কুল রাস্তা ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করছে। উভয় দলই মৃত্যুঝুঁকি জেনেও এসব পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে কারণ তাদের সামনে কোনো নিরাপদ বা বৈধ বিকল্প পথ নেই।

অব আফ্রিকা অঞ্চল থেকে আসা অধিকাংশ অভিবাসীরই মূল লক্ষ্য থাকে ইয়েমেন সীমান্ত পার হয়ে সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তবে বিপজ্জনক রাস্তা অতিক্রম করতে গিয়ে তারা স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতন, বন্দিদশা ও চরম আর্থিক শোষণের শিকার হন। শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার তরুণ কোনো টাকা-পয়সা ছাড়া নিঃস্ব হয়ে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে চিরতরে আটকে যান, যেখান থেকে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ারও কোনো নিরাপদ উপায় তাদের থাকে না।

Logo