Logo
×

Follow Us

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়া থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৮

অস্ট্রেলিয়া থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহে অস্বাভাবিক পতন দেখা দিয়েছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের রেকর্ড উচ্চ হার, অতিরিক্ত আবেদন ফি এবং সরকারের সাম্প্রতিক অভিবাসননীতির অনিশ্চয়তার কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাবে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে দেশটির স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই ও প্রশাসনিক বাজেট সংকোচনের কঠোর পথ বেছে নিচ্ছে।

১১ অক্টোবর শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই করুণ রূপরেখা ফুটে উঠেছে। শিক্ষা বিভাগের প্রকাশিত অক্টোবরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত মোট আসনের গড়ে মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে পেরেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দেশটির ৩৬টি প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কেবল পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তাদের বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি আসন পূর্ণ করতে পেরেছে। রাজধানী ও বড় শহরের বাইরের আঞ্চলিক এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।

নিউ সাউথ ওয়েলসের খ্যাতনামা চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটি চলতি বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত কোটার মাত্র ৪০ শতাংশ আসন পূরণ করতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে গত বছরের তুলনায় বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, যা মহামারি পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশে নেমে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা মাইক ফার্গুসন জানান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় বছরে তাদের প্রায় সাড়ে তিন কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ফার্গুসন আরো জানান, স্টুডেন্ট ভিসার অতিরিক্ত আবেদন ফি এবং উচ্চ ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারই এই সংকটের মূলে। বর্তমানে দেশটিতে স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনের ফি বাড়িয়ে দুই হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার করা হয়েছে, যা ভিসা বাতিল হলেও আর ফেরত পাওয়া যায় না। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবেদনকারীদের প্রায় ৫৩ শতাংশের ভিসা সরাসরি বাতিল করা হচ্ছে। ফলে বিপুল অর্থ হারিয়ে ফেলার চরম ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশীয় মেধাবী শিক্ষার্থীরা অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ফি কমে যাওয়ার ধাক্কা ছড়িয়ে পড়েছে সিডনির বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক জর্জ উইলিয়ামস সতর্ক করে জানান, প্রবাসীদের টিউশন ফি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে দেশীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার বড় অংশ পরিচালিত হয়। বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি বিভিন্ন সেবা ও উন্নত মানসম্পন্ন গবেষণা কার্যক্রম চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। অভিবাসন সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিতর্ক প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

একইরকম সংকটে পড়েছে ভিক্টোরিয়ার ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য ডানকান বেন্টলি আঞ্চলিক এলাকার জন্য বিশেষ দক্ষতাভিত্তিক স্টুডেন্ট ভিসা চালুর তাগিদ দিয়েছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সংগঠন 'ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের' প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আঞ্চলিক এলাকায় বিদেশি শিক্ষার্থী না আসলে ভবিষ্যতে সেবিকা, শিশু পরিচর্যা, প্রবীণ সেবা ও প্রকৌশল খাতে দক্ষ কর্মীর তীব্র আকাল দেখা দেবে।

অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬ সালের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সার্বিক জাতীয় সীমা দুই লাখ ৯৫ হাজার নির্ধারণ করেছিল। তবে বর্তমান মন্দা পরিস্থিতিতে বছর শেষে নতুন শিক্ষার্থী সংখ্যা সর্বসাকুল্যে আড়াই লাখে সীমিত থাকতে পারে। এরই মধ্যে গত ২ অক্টোবর থেকে অধিকাংশ অস্থায়ী ভিসাধারীর অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে অবস্থান করে নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে সরকার।

পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় এলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি আরো কমিয়ে বছরে দুই লাখ ৪০ হাজারে সীমিত করার কঠোর প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। সরকারের এসব ধারাবাহিক বিধিনিষেধের ফলে দেশটির অন্যতম প্রধান অর্থকরী খাত আন্তর্জাতিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, যা সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

Logo