থাইল্যান্ডের থাই-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী শহর মে সোটে বিদেশি পর্যটকদের অপহরণ করে প্রতিবেশী মিয়ানমারের কুখ্যাত সাইবার স্ক্যাম কেন্দ্রগুলোতে পাচারের এক চরম উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। সীমান্ত এলাকায় প্রলোভন ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশিদের পাচার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর চাঞ্চল্যকর বিবরণ এবং থাই সংবাদমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধান এই আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের নির্মম সত্য উন্মোচন করেছে।
প্রকাশ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম রেডিটে 'থাইল্যান্ডে পর্যটক অপহরণ ও বিক্রি' শিরোনামে প্রকাশিত এক বাসিন্দার বিবরণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মে সোতের ময়ে নদীর তীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাসকারী ওই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সেখানে অবৈধ পারাপার প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তিনি নিজে একাধিক মানুষকে শক্ত ক্যাবল দিয়ে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে করে নিয়ে যেতে দেখেছেন। এমনকি একজনকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে গাড়ির ট্রাংকে তুলে পাচারের চেষ্টা করা হলে তিনি স্থানীয় পুলিশকে ভিডিও ফুটেজসহ খবর দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই অভিযোগের কিছুদিন পরই থাইল্যান্ডের প্রখ্যাত পত্রিকা 'থাই রথ' একটি বাস্তব ও গুরুতর ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চলতি বছরের মার্চে চারজন চীনা নাগরিক বৈধ ভিসা নিয়ে ব্যাংককের বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। চিয়াং মাই ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেও এক সংগঠিত পাচারকারী চক্র তাদের প্রতারণা করে মে সোতের থা ফুটসা সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে পিকআপ গাড়ি থেকে কৌশলে পালিয়ে তারা থাই পুলিশের কাছে নিজেদের জীবন রক্ষা করেন। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয় যে, দেশটিতে বৈধভাবে আসা পর্যটকদেরও বলপূর্বক লক্ষ্য বানাচ্ছে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা।
এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণকারীদের মধ্যে নতুন করে তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ভুক্তভোগীরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ছিলেন না, তারা দেশের বিমানবন্দর দিয়ে আইনিভাবে প্রবেশ করেছিলেন। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র থাইল্যান্ডের সুশৃঙ্খল পর্যটন অবকাঠামোকে নিজেদের অপরাধমূলক কাজের জন্য ব্যবহার করছে। বিমানবন্দরের ট্যাক্সি, অভ্যন্তরীণ সড়ক পরিবহন ও হোটেল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে দূরবর্তী সীমান্ত অঞ্চলে মানুষকে পাচার করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা এখন অপরাধের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এমন এক আন্তর্জাতিক সংকটে জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা, প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন এবং থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিমানবন্দরে যাত্রী নামার পর থেকে সীমান্ত পর্যন্ত পরিবহন ব্যবস্থার ওপর কোনো বিশেষ নজরদারি দেখা যাচ্ছে না। পর্যটন খাতের এই প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিশাল এই অপরাধ চক্র থাইল্যান্ডের মাটিতে নির্বিঘ্নে তাদের জাল বিস্তার করছে বলে অভিযোগ উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল সাধারণ পর্যটকরাই নন, পর্যটন শিল্পে কর্মরত বহুমাত্রিক ভাষায় দক্ষ তরুণ-তরুণীরাও এখন এই অপরাধী চক্রের মূল টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। থাইল্যান্ডের উচিত নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি রক্ষার কৃত্রিম চেষ্টার চেয়ে মানুষের জীবন সুরক্ষায় জোরালো গুরুত্ব দেওয়া। বিমানবন্দরে সন্দেহজনক পরিবহন বন্ধ করা, হোটেলগুলোতে বাড়তি নজরদারি এবং সীমান্তে কঠোর পুলিশি তল্লাশি চালনা করা এখন সময়ের বড় দাবি। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে থাইল্যান্ডের পর্যটন খাতের প্রতি বিশ্বজুড়ে অর্জিত আস্থা চিরতরে ধসে পড়তে পারে।
logo-1-1740906910.png)