অস্ট্রেলিয়া দ্বীপাঞ্চল অভিবাসন নীতি: ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শিক্ষা
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৯
শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মূল ভূখণ্ডের বাইরে দূরের দ্বীপে পাঠাতে দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিতর্কিত 'অফশোর প্রসেসিং' বা দ্বীপাঞ্চলীয় প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আসছে অস্ট্রেলিয়া। এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্রও তাদের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একই পথ অনুসরণ করতে চাইছে। তবে এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড তৈরি হয়েছে। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডি ডব্লিউর মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ক্যানবেরার এই মডেল একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
অস্ট্রেলিয়া মূলত প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু এবং পাপুয়া নিউগিনির মানুস দ্বীপে আশ্রয়প্রার্থীদের বন্দি রেখে তাদের আবেদনের পর্যালোচনা করে থাকে। সরকার এই নীতিকে মানব পাচারকারীদের প্রতিরোধ করা ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা বন্ধের কার্যকারী হাতিয়ার বলে দাবি করে। তবে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের এই নিবর্তনমূলক কৌশল আদতে কতটা মানবিক বা সফল হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার ফোরামে বহু বছর ধরে প্রবল বিতর্ক চলছে।
২০০১ সালে তৎকালীন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড বিতর্কিত 'প্যাসিফিক সলিউশন' নীতির সূচনা করেছিলেন। সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে ঢুকতে না দিয়ে সরাসরি নাউরু ও পাপুয়া নিউগিনির অস্থায়ী শিবিরে পাঠানো শুরু হয়। সেই সময় হাওয়ার্ড স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, কারা দেশে আসবে তা অস্ট্রেলিয়াই নির্ধারণ করবে। পরবর্তীতে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে ২০০৮ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এসে এই নীতিকে চরম ব্যয়বহুল ও ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
তবে সমুদ্রপথে প্রাণহানি বাড়লে ২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডের নেতৃত্বে গঠিত সরকার পুনরায় দ্বীপাঞ্চলীয় অভিবাসনকেন্দ্রগুলো চালু করতে বাধ্য হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে তিন হাজারের বেশি মানুষকে এসব দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ওই কেন্দ্রগুলোতে স্বাধীন তদারকি সংস্থা ও সাংবাদিকদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখায় সেখানকার প্রকৃত চিত্র ও অমানবিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে পড়ে থাকে।
অস্ট্রেলিয়ার এসব দূরবর্তী শিবিরে বছরের পর বছর আটকে থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর নির্যাতন, অবহেলা এবং চরম স্বাস্থ্যসেবার অভাবের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে মানুস দ্বীপে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা নির্যাতিত আশ্রয়প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে মামলা করে অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছ থেকে সাত কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের ক্ষতিপূরণ আদায় করেন। সম্প্রতি দেশটির সিনেট কমিটিতেও শিবিরে নারী ও শিশুদের ওপর মারাত্মক অবহেলার সাক্ষ্য উঠে এসেছে। এর আগে জাতিসংঘের ৭৩টি সদস্য দেশ সরাসরি এই নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি এই নীতি অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০১২ সালের পর থেকে এই প্রক্রিয়ায় অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যে এক হাজার ৩০০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারেরও বেশি অর্থ খরচ করেছে। শুধু তা-ই নয়, অপরাধে দণ্ডিত কিন্তু নিজ দেশে ফেরত না পাঠানো বিদেশি নাগরিকদের রাখার জন্য সম্প্রতি নাউরুর সাথে নতুন করে আড়াইশো কোটি ডলারের ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি সই করেছে ক্যানবেরা।
অস্ট্রেলিয়ার এমন নেতিবাচক অভিজ্ঞতার পরও ইইউ একই পথে হাঁটতে যাচ্ছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ২০২৭ সালের মধ্যে বেআইনি অভিবাসীদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর জন্য 'রিটার্ন হাব' তৈরির অনুমোদন দিয়েছে। রুয়ান্ডা, উজবেকিস্তান ও উগান্ডার মতো দেশের সাথে চুক্তি করার পরিকল্পনা করছে জোটটি। সদস্য দেশগুলো এই কেন্দ্রগুলোকে শাস্তিমূলক নয় বলে দাবি করলেও সেখানে দীর্ঘমেয়াদী আটকাদেশ ও ইউরোপে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার নিয়ম রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও তৃতীয় দেশে অভিবাসী ফেরত পাঠানোর দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত পদক্ষেপকে সবুজ সংকেত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ৩০টি দেশের সাথে এ সংক্রান্ত সমঝোতা সম্পন্ন করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার উপেক্ষা করে গড়ে তোলা এসব দূরবর্তী অভিবাসন ব্যবস্থা শুধু আর্থিক অপচয়ই বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে মানবিক সংকটকে আরো গভীর করে তুলবে।
logo-1-1740906910.png)