অনলাইন স্ক্যামিং: ঝুঁকিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাচার হওয়া লাখো মানুষ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা এখন শুধু সাইবার অপরাধ নয়, এটি একটি বড় মানব পাচার সংকটে রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে ৩ লাখের বেশি মানুষকে বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণা চক্রে জোরপূর্বক কাজ করানো হয়েছে।
এ সংকট মোকাবিলায় সম্প্রতি ব্যাংককে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করেছে DW Akademie এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক আঞ্চলিক দপ্তর। কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল অনলাইন প্রতারণার পেছনের মানবপাচার, নির্যাতন এবং আধুনিক দাসত্বের বাস্তবতা তুলে ধরতে সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সিনথিয়া ভেলিকো বলেন, অনলাইন প্রতারণা পরিচালিত হয় বৃহৎ আকারের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের মাধ্যমে। মেকং অঞ্চলের অনেক সাবেক ক্যাসিনোকে কলসেন্টারে রূপান্তর করে সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তার মতে, “ট্রাফিকিং ফর ফোর্সড স্ক্যামিং” বা প্রতারণার কাজে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে মানব পাচার হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে নিয়ে পরে জোর করে অনলাইন জালিয়াতিতে যুক্ত করা হয়। এটি আধুনিক দাসত্বের এক নতুন রূপ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ভুক্তভোগী প্রথমে বৈধ চাকরির প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশ মানুষ জানিয়েছেন, পরিচিত কারও মাধ্যমে তারা চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। অন্যদের একটি বড় অংশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিয়োগ করা হয়।
বিদেশে পৌঁছানোর পর অনেকের পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর শারীরিক নির্যাতন, ভয়ভীতি ও বন্দিত্বের মাধ্যমে তাদের অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একজন ভুক্তভোগীকে এক প্রতারণা কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে বিক্রিও করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে। একজন বাংলাদেশি জানান, তাকে মারধর করা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে। অন্য ভুক্তভোগীরা শাস্তি হিসেবে দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখা, পানির ট্যাংকে আটকে রাখা এবং নির্যাতনের কথা বলেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব কেন্দ্র থেকে পালিয়ে আসার পরও ভুক্তভোগীরা নিরাপদ হতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের গ্রেপ্তার, আটক, সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক দুর্দশা ও মানসিক ট্রমার মুখোমুখি হতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অপরাধচক্রগুলোর বার্ষিক আয় প্রায় ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর তাদের শিকারে পরিণত হওয়া মানুষ এসেছে অন্তত ৮০টি দেশ থেকে।
DW Akademie-এর ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক আন্দ্রেয়া মার্শাল বলেন, শরণার্থী ও অভিবাসীরা ভাষাগত বাধা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈধ কাজের সীমিত সুযোগের কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরো বেশি।
তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে অপরাধচক্রগুলো শুধু অসহায় মানুষকে শোষণই করে না, বরং তাদের দিয়েই অন্যদের প্রতারণা করায়। ফলে ভুক্তভোগীরা একসময় অপরাধের অংশ হয়ে যায়, যদিও তারা নিজেরাও মানব পাচারের শিকার।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগী এই ধরনের প্রতারণা কেন্দ্র সম্পর্কে আগে কখনো শুনেননি। অথচ তাদের ৭০ শতাংশ ভবিষ্যতে আবার বিদেশে কাজের জন্য যাওয়ার কথা ভাবছেন।
সাংবাদিকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে আন্দ্রেয়া মার্শাল বলেন, গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে শুধু প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের গল্প তুলে ধরেছে। কিন্তু প্রতারণা পরিচালনায় বাধ্য হওয়া মানব পাচারের শিকার মানুষের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের সতর্ক করে বলেন, কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ যাচাই ছাড়া “প্রতারক” হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রে তিনি একই সঙ্গে অপরাধে ব্যবহৃত এবং মানব পাচারের শিকার একজন ব্যক্তি হতে পারেন।
জাতিসংঘ ও DW Akademie সাংবাদিকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, ভুক্তভোগীদের সম্মতি নেওয়া, পরিচয় সুরক্ষা করা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূল শর্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা এখন আর শুধুমাত্র সাইবার অপরাধ নয়; এটি মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম এবং আধুনিক দাসত্বের বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে জনসচেতনতা বাড়বে এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসীদের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
logo-1-1740906910.png)