দেড় হাজার শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরাল মালয়েশিয়া; জাতিসংঘের উদ্বেগ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭
যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত মিয়ানমারে প্রায় দেড় হাজার শরণার্থী ও অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সেই সতর্কতা উপেক্ষা করে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করেছে কুয়ালালামপুর।
৪ অক্টোবর সকালে মালয়েশিয়া থেকে পাঠানো ১ হাজার ৪৭৯ জন শরণার্থী ও অভিবাসীকে বহনকারী নৌযান ইয়াঙ্গুনের দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছায়। মিয়ানমারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এর আগে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ এবং একটি চিকিৎসাসেবাবিষয়ক জাহাজে করে এসব অভিবাসী মালয়েশিয়া ত্যাগ করেন।
মালয়েশিয়া সরকার বলছে, ফেরত যাওয়া ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে সম্মত হয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন আটক থাকা এবং সীমিত বিকল্প থাকার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রত্যাবাসনে রাজি হয়েছেন।
এই প্রত্যাবাসন কর্মসূচি মিয়ানমারের ৫ হাজার নাগরিককে ফেরত পাঠানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন অভিবাসন আটককেন্দ্রে এখনো ১০ হাজার ৩০০-এর বেশি মিয়ানমার নাগরিক রয়েছেন।
ইউএনএইচসিআর গত সপ্তাহে জানায়, ফেরত পাঠানোর আগে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কর্মকর্তাদের দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে প্রত্যাবাসিতরা স্বাধীনভাবে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জেনে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিনা, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত মিয়ানমারের শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। তবে এবার ফেরত পাঠানো ১ হাজার ৪৭৯ জনের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা রয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই তথ্যের অনুপস্থিতি পরিস্থিতি নিয়ে আরো প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মালয়েশিয়ায় চলতি বছর অভিবাসী ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি শরণার্থী ও অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশটিতে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে জনমত কঠোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাবাসন নীতিও আরো কঠিন হয়েছে।
গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। এর আগেই দেশটিতে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
এখন দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি শরণার্থী ও অভিবাসীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, বিপুলসংখ্যক অনিয়মিত অভিবাসী দেশটির অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো নিরাপদ নয়। বিশেষ করে সামরিক সরকারের অধীনে দেশে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মানবাধিকার সংগঠন ফোর্টিফাই রাইটসের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ইয়াপ লে শেং বলেছেন, দেশে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা সরকার কী ধরনের আচরণ করবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার গত মাসে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ পরিবেশে গ্রহণ করা হবে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিস্থিতিরও মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে।
logo-1-1740906910.png)