ভারতের সেরা ৫ রেলপথ; প্রতি বছর ভ্রমণে আসে লক্ষ পর্যটক
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০
ভ্রমণের আনন্দ শুধু গন্তব্যে নয়, অনেক সময় পথও হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ। বিশ্বের বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কগুলোর একটি ভারতের রেলপথ এমনই কিছু অভিজ্ঞতার সুযোগ দেয়, যেখানে ট্রেনের জানালার বাইরের দৃশ্যই হয়ে ওঠে ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ। পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, বনাঞ্চল, চা-বাগান ও ঐতিহাসিক রেলপথ মিলিয়ে ভারতের কয়েকটি ট্রেনযাত্রা পর্যটকদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এসব রুটের অনেকগুলো ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে।
কনকন রেলওয়ে: সমুদ্র আর পাহাড়ের অপূর্ব মেলবন্ধন
মুম্বাই, গোয়া ও ম্যাঙ্গালুরুকে সংযুক্ত করা প্রায় ৭৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ কনকন রেলওয়ে ভারতের সবচেয়ে সুন্দর রেলপথগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, সবুজ বন, নদী, উপত্যকা, ধানক্ষেত এবং আরব সাগরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এই যাত্রাকে অসাধারণ করে তোলে। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা অসংখ্য ঝরনা পুরো পথকে রূপকথার দৃশ্যে পরিণত করে। দুই হাজারের বেশি সেতু এবং প্রায় ৯০টি টানেলও এই রেলপথের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কালকা-শিমলা রেলপথ: ইতিহাস আর প্রকৃতির যুগলবন্দি
১৯০৩ সালে চালু হওয়া কালকা-শিমলা রেলপথ ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক ট্রেনযাত্রা। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই সরু গেজের রেলপথ হরিয়ানা থেকে হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি শহর শিমলা পর্যন্ত বিস্তৃত। পাইন বন, পাহাড়ি গ্রাম, মেঘে ঢাকা উপত্যকা এবং ঔপনিবেশিক আমলের ছোট ছোট স্টেশন এই যাত্রাকে অনন্য করে তুলেছে। প্রায় ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে শতাধিক টানেল ও অসংখ্য সেতু অতিক্রম করে ট্রেনটি ধীরে ধীরে হিমালয়ের কোলে উঠে যায়।
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে: পাহাড়ি খেলনা ট্রেনের মোহ
ভারতের সবচেয়ে পরিচিত ট্রেনভ্রমণের নামগুলোর মধ্যে অন্যতম দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে। ‘টয় ট্রেন’ নামে পরিচিত এই রেলপথ ১৮৮১ সাল থেকে চলাচল করছে। এটি ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যও। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত যাত্রাপথে দেখা যায় বিস্তীর্ণ চা-বাগান, কুয়াশাঘেরা বনাঞ্চল এবং পাহাড়ি জনপদ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হলো বাতাসিয়া লুপ, যেখানে বৃত্তাকার রেললাইন ঘুরে পাহাড়ে ওঠে ট্রেন। পরিষ্কার আবহাওয়ায় এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার চমৎকার দৃশ্যও দেখা যায়।
নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে: দক্ষিণ ভারতের পাহাড়ি সৌন্দর্য
দক্ষিণ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় রেলপথ নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে। মেট্টুপালায়ম থেকে উটি পর্যন্ত এই যাত্রায় সমতল ভূমি থেকে ধীরে ধীরে পাহাড়ি অঞ্চলে উঠে যায় ট্রেন। পথজুড়ে দেখা যায় চা-বাগান, ইউক্যালিপটাস বন, ঝরনা এবং মনোরম পাহাড়ি শহর। এই রেলপথের বিশেষ আকর্ষণ হলো বিরল ‘র্যাক অ্যান্ড পিনিয়ন’ প্রযুক্তি, যা খাড়া পাহাড়ি পথে ট্রেন চলতে সহায়তা করে। এখনো কিছু অংশে ঐতিহ্যবাহী স্টিম ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়, যা পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ।
জম্মু-বারামুলা রেলপথ: কাশ্মীরের হৃদয়ে ট্রেনযাত্রা
ভারতের সবচেয়ে নতুন এবং সবচেয়ে আলোচিত মনোরম রেলপথগুলোর একটি হলো জম্মু-বারামুলা রেললাইন। উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল সংযোগ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা এই রুট কাশ্মীর উপত্যকার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে গেছে। এই পথে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলওয়ে আর্চ ব্রিজ হিসেবে স্বীকৃত চেনাব রেলসেতু। চেনাব নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু আধুনিক রেল প্রকৌশলের এক অনন্য উদাহরণ। যাত্রাপথে দেখা যায় তুষারঢাকা পাহাড়, গভীর গিরিখাত, সবুজ তৃণভূমি, ফলের বাগান এবং কাশ্মীরের বিখ্যাত উপত্যকার নয়নাভিরাম দৃশ্য।
পর্যটকদের মতে, বিমানযাত্রার দ্রুততার যুগেও এসব রেলপথ প্রমাণ করে যে ধীরগতির ভ্রমণই কখনো কখনো সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। প্রকৃতি, ইতিহাস এবং প্রকৌশলের অনন্য মেলবন্ধন দেখতে চাইলে ভারতের এই পাঁচ ট্রেনপথ হতে পারে যেকোনো ভ্রমণপিপাসুর স্বপ্নের যাত্রা।
logo-1-1740906910.png)