ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এখন সহিংস রূপ নিয়েছে। দেশজুড়ে চলমান আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ৫০০টির বেশি স্কুল। হামলায় আহত হয়েছেন বহু শিক্ষক, স্কুল কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্য।
শিক্ষক সংকট এবং জরাজীর্ণ শিক্ষা অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কয়েক দিন ধরে চলা আন্দোলন বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। বেশ কয়েকটি স্কুলে অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে আগুন এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বৃহস্পতিবারই ১ হাজার ৯৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চলমান সহিংসতায় অন্তত ৬৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন প্রধান শিক্ষকও রয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি দল এক নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে ধাওয়া করে মারধর করছে। তিনি তখন হাতে টিয়ার গ্যাসের ক্যানিস্টার বহন করছিলেন।
এছাড়া সংঘর্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু শিক্ষার্থীর চোখে আঘাত লেগেছে এবং অন্তত একজন দাঁত হারিয়েছেন। পশ্চিমাঞ্চলের অ্যাঞ্জার্স শহরে একটি স্কুলের বাইরে এক শিক্ষককে লোহার রড দিয়ে আঘাত করার ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্স সরকারের দাবি, শিক্ষার্থীদের ন্যায়সংগত কিছু দাবি থাকলেও আন্দোলনে বাইরের উসকানিদাতারা ঢুকে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করছে।
এক সরকারি বৈঠকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিযোগ করে, বামপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কিছু সদস্য আন্দোলন উসকে দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা লুই বোয়ার।
শিক্ষামন্ত্রী গেফ্রে স্বীকার করেছেন যে শিক্ষার্থীদের অনেক দাবি যৌক্তিক। তিনি শিক্ষক ইউনিয়ন, অভিভাবক সংগঠন এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের ঘোষণা দিয়েছেন।
ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ বলেন, সহিংসতায় জড়িত সবাই শিক্ষার্থী বলে মনে হচ্ছে না। তার মতে, একটি সক্রিয় ও সহিংস গোষ্ঠী আন্দোলনকে আরো উগ্র করে তুলেছে।
তিনি বলেন, “বাসে হামলা, স্কুলে অগ্নিসংযোগ বা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করা আর সাধারণ বিক্ষোভের মধ্যে পড়ে না। এটি এখন জননিরাপত্তার ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে পরিস্থিতি সবচেয়ে উত্তপ্ত ছিল। সেখানে অন্তত দুটি উচ্চবিদ্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্ট্রাসবুর্গে একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তৌলুজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
মার্সেইয়ের ভিক্টর হুগো স্কুলে শিক্ষকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রসিকিউটরদের দাবি, কয়েকজন শিক্ষককে পেট্রোল ছিটিয়ে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
আরেক ঘটনায় সেন্ট-এক্সুপেরি উচ্চবিদ্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভকারীরা একটি দমকল বাহিনীর ট্রাক ঘিরে ধরে। পরে সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সহিংসতার কারণে শহরটিতে সাময়িকভাবে গণপরিবহন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়।
নঁত শহরে একটি স্কুলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। উত্তরাঞ্চলের ল্য হাভর শহরের আরেকটি স্কুলের সামনের অংশও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে সহিংসতার মধ্যেও অনেক শিক্ষার্থী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্যারিসের উপকণ্ঠ সেন্ট-দেনিতে এক শিক্ষার্থী একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল, “আমরা কি টিয়ার গ্যাস ছাড়া নিজেদের কথা বলতে পারি না?”
পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে সরকার। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে আলোচনার পথও খোলা রাখা হয়েছে। তবে আন্দোলন কত দ্রুত শান্ত হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
logo-1-1740906910.png)