বিশ্বজুড়ে মানব পাচারের নতুন রূপ দেখা দিয়েছে। অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলোতে মানুষকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অপরাধে যুক্ত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) জানিয়েছে, এটি এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল সংগঠিত অপরাধের একটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। গ্রাহকসেবা, মার্কেটিং, বিক্রয়, প্রশাসন কিংবা প্রযুক্তি খাতে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, চলাফেরায় বাধা দেওয়া হয় এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতারণা কেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ মানুষ জোরপূর্বক কাজ করছে। এদের মধ্যে অন্তত ৮০টি দেশ ও অঞ্চলের নাগরিক রয়েছেন।
২০২৫ সালে পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে প্রতারণাজনিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮.৩ থেকে ১১৪.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
নিয়োগ প্রক্রিয়া মূলত অনলাইনে হয়। টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম। চাকরির বিজ্ঞাপনে মাসিক ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ ডলার বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের দিয়ে সাধারণত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতারণা, প্রেমের ফাঁদ, ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য অনলাইন প্রতারণা চালানো হয়। তারা মাসের পর মাস এসব কেন্দ্রে আটকে থাকে, অনেক সময় এক বছরেরও বেশি।
পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত, চলাফেরায় বাধা, সার্বক্ষণিক নজরদারি, বেতন আটকে রাখা, মানসিক নির্যাতন, শারীরিক সহিংসতা এবং পরিবারের প্রতি হুমকি- এসবই তাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। অনেক পরিবার চাকরির আশায় জমি বিক্রি করে দেনা করেছে, পরে মুক্তিপণ দিতে গিয়ে আরো ঋণে জড়িয়েছে।
এটি আর শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক সংগঠিত অপরাধে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অনেক সময় অপরাধী হিসেবে দেখা হয়, অথচ তারা আসলে মানবপাচারের শিকার। উদ্ধারই শেষ নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদে দেশে ফেরার ব্যবস্থা প্রয়োজন।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আইওএম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার ৫০০ জন ভুক্তভোগীকে সহায়তা করেছে। এরা এসেছেন ৩৮টি দেশ থেকে। শুধু ২০২৫ সালেই বিশ্বজুড়ে ১৩,৬৩৮ জন মানবপাচারের শিকারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই বছরে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসীকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
আইওএম ভুক্তভোগীদের নিরাপদে দেশে ফেরানো, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা এবং সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করে প্রতিরোধ ও সীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করছে।
অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রের মাধ্যমে মানব পাচার এখন বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধীরা আরো শক্তিশালী হচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
logo-1-1740906910.png)